ভোরের কুয়াশা ভেদ করে আড়াইহাজারের মেঘনা নদীতে যখন ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়, তখন জেলের জালে রূপালি ইলিশের বদলে কেবল জমে দীর্ঘশ্বাস। মহাজনের দাদনের চাবুক, অসাধু চক্রের চাঁদাবাজি আর প্রশাসনিক নীরবতায় এই নদীর প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে আছে হাজারো জেলের অভিশাপ ও চোখের পানি। মেঘনার বুকজুড়ে ইলিশের এই মৌসুমে চলছে এক নির্মম লুণ্ঠন, যেখানে পেটের দায়ে নামা জেলের থলে শূন্য হলেও ফুলেফেঁপে উঠছে সিন্ডিকেটের পকেট।
মেঘনার বর্তমান চিত্র ও জেলের কান্না
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে মেঘনা নদী একসময় জেলের মুখে হাসি ফোটালেও আজ তা কেবল কান্নার রোল। কালাপাহাড়িয়া, বিশনন্দী, হাইজাদী ও খাগকান্দা ইউনিয়নের মেঘনা তীরবর্তী গ্রামগুলোর প্রায় ১৫ হাজার জেলের জীবন এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে।
নদীর বুকে ইলিশ ধরা পড়ার কথা থাকলেও জালে উঠছে শুধুই হাহাকার। মেঘনার পাড়ে বসে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব জেলে মোতালেব মিয়ার সঙ্গে। মলিন কাপড়ে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “বাবা, সারারাত জাল বাইয়া দুইটা ইলিশ পাইছি। হেইডা দিয়া অহন না খাওয়ার জোগাড়। মহাজনের টেকা দিমু ক্যামনে, আর গ্যালাপোলারে কি খাওয়ামু?”
তার মতো শত শত জেলের একই করুণ চিত্র। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রভাবশালীরা অবাধে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করায় প্রাকৃতিকভাবে প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না।
দালাল ও মহাজনদের দাদন বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনার ইলিশ ব্যবসাকে গ্রাস করেছে এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘দাদন চক্র’। এই চক্রের প্রধান হাতিয়ার হলো চড়া সুদে ঋণ দেওয়া। সর্বস্বান্ত জেলেরা মৌসুমের শুরুতে সংসার চালাতে বা ট্রলার মেরামত করতে মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নেন।
শর্ত থাকে যে, ইলিশ পাওয়ার পর তা খোলা বাজারে বিক্রি করা যাবে না; কম দামে নির্দিষ্ট মহাজনের কাছেই বিক্রি করতে হবে। ১ লক্ষ টাকা দাদন নিলে জেলের উপার্জিত পুরো ইলিশের সিংহভাগই চলে যায় সুদের কিস্তি শোধ করতে। ফলে জেলেরা আজীবন ঋণের জালেই আটকা থাকে।
আড়াইহাজারের স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র এই দাদন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, “প্রশাসনের কিছু অসাধু লোক এবং রাজনৈতিক ছাব্বিশের হাত ধরেই এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। জেলের ঘামে ভেজা ইলিশের ৯০ শতাংশ মুনাফাই চলে যায় দালালদের পেটে।”
প্রশাসন ও ঘাটের অবৈধ চাঁদাবাজি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে বলেন, মেঘনা পারের একাধিক মৎস্য ঘাটে ওপেন সিক্রেট চলছে চাঁদাবাজি। বিশনন্দী ও কালাপাহাড়িয়া ঘাটে প্রতিদিন শত শত মণ ইলিশ বেচাকেনা হয়। প্রতিটি ট্রলার ঘাট থেকে নামানোর সময় এবং বিক্রির পর নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় লাইনম্যান ও মাস্তানদের। সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হয় জেলেদের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চললেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত মাসোহারা পাওয়ার কারণে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় চোখ বন্ধ করে থাকে।
ইকোসিস্টেমের ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ সংকট
শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয়, মেঘনার ইলিশ আজ পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে। অবৈধ কারেন্ট জাল এবং বেহুন্দি জালের যত্রতত্র ব্যবহারের কারণে ছোট আকারের ইলিশ বা জাটকাও রক্ষা পাচ্ছে না। শিল্পবর্জ্য ও পলিথিনের দূষণে মেঘনার তলদেশ আজ ইলিশের প্রজনন অনুকূল পরিবেশ হারাচ্ছে। যদি এখনই এই অবৈধ জাল ব্যবহার এবং চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য থামানো না যায়, তবে অচিরেই মেঘনা থেকে হারিয়ে যাবে বাংলার জাতীয় মাছ ইলিশ।
আড়াইহাজারের মেঘনা নদী কেবল একটি জলধারা নয়, এটি হাজারো জেলের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। দালালদের থাবা আর প্রশাসনের উদাসীনতায় এই অবলম্বন আজ ধ্বংসের মুখে। জেলের এই কান্না থামানোর সময় এখনই। মেঘনাকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে এবং প্রকৃত জেলেদের অধিকার রক্ষা করতে প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, দাদন প্রথার বিলুপ্তি এবং সৎ উপায়ে মৎস্য শিকারের সুযোগ তৈরি করা। তবেই না মেঘনার বুকে আবার ফিরে আসবে জেলের মুখে সোনালী হাসি।





