সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই জালকুড়ি, মাহমুদপুর, ভূইগর কিংবা ব্যাংক কলোনীর অলিগলি—কোথাও এক মুহূর্ত টেকা দায়। কামড়ের জ্বালা আর ঝাঁঝালো গুঞ্জনে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন। সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মশক নিধন বাজেট আর কাগজে-কলমে বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকার ফগিংয়ের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের মিল যেন বিন্দুমাত্র নেই। ড্রেন ও জমে থাকা নোংরা পানির নালায় অভিযান চালিয়ে মশার লার্ভা ধ্বংসের চিরচেনা দৃশ্য এখানে কেবলই প্রহসন। অভিযোগ রয়েছে, মশার ওষুধ তো দূরের কথা, নামমাত্র লোক দেখানো কিছু কেরোসিন মিশ্রিত স্প্রে ছিটিয়েই খালাস সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মশার এই ভয়াবহ দৌরাত্ম্য কেবল সাধারণের স্বস্তিই কেড়ে নেয়নি, বরং নারায়ণগঞ্জের জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিচ্ছে মারাত্মক ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিতে।
বাজেট বরাদ্দ বনাম বাস্তব চিত্র: কোথায় হারায় মশার ওষুধ?
প্রতি বছর বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুম—উভয় সময়ই মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য মোটা অঙ্কের বাজেট পাস হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
জালকুড়ি ও ভূইগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বড় বড় বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কোনো বালাই নেই। মাঝেমধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দেখা মিললেও কার্যকর মশার ওষুধ বা ফগিংয়ের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় নামমাত্র কেরোসিন স্প্রে। কেরোসিনের এই তীব্র গন্ধে সাময়িকভাবে কিছু মশা দূরে সরে গেলেও লার্ভা বা বংশবিস্তার রোধে এর কোনো স্থায়ী প্রভাব পড়ে না। অথচ বরাদ্দের পুরো অর্থই খাতায়-কলমে খরচ দেখানো হয়, যার সত্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মনে দানা বেঁধেছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন।
প্রজননক্ষেত্র ও নাগরিক দুর্ভোগ
মাহমুদপুর ও ব্যাংক কলোনীর রাস্তাঘাট ঘুরে দেখা গেছে, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করা নর্দমাগুলোই আজ মশার প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ময়লার ভাগাড় আর জমে থাকা স্থির পানিতে অবাধে বংশবিস্তার করছে কিউলেক্স ও এডিস মশা। দিনের বেলা কিছুটা বিরতি থাকলেও বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণ শুরু হয়। বাধ্য হয়ে এলাকার মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে কয়েল কিংবা স্প্রে ব্যবহার করেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। সন্ধ্যার পর দোকানপাট, খোলা প্রান্তর কিংবা বারান্দায় বসা তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরেই টিকতে পারছেন না নগরবাসী।
জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও জরুরি করণীয়
মশার উপদ্রব এখন আর শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি নারায়ণগঞ্জের লাখো মানুষের জন্য এক নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। এলাকাবাসীর জোরালো দাবি কাগজ কলমের হিসাব বাদ দিয়ে অবিলম্বে জালকুড়ি, মাহমুদপুর, ভূইগর ও ব্যাংক কলোনীতে বিশেষ ফগিং অভিযান পরিচালনা করতে হবে। নামমাত্র কেরোসিন স্প্রে বাদ দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত মানসম্মত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড নিশ্চিত করতে হবে। ড্রেন-নালা নিয়মিত পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধ স্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর তদারকি ছাড়া কেবল লোক দেখানো পদক্ষেপে নারায়ণগঞ্জের এই জনদুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।



