নারায়ণগঞ্জ । বৃহস্পতিবার
২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অরক্ষিত’ চার জ্বালানি ডিপোতে ট্র্যাজেডির শঙ্কা!

বিশেষ প্রতিনিধি : অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়া সত্বেও যেন ‘নিরাপদে’ নেই নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত জ্বালানি তেলের চারটি ডিপো| স্থানীয়রা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা| ম্যাসাকার হতে পারে ডিপোসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো|

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ন ও ব্যস্ততম দুই অঞ্চল ফতুল্লা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকায় রয়েছে চার চারটি জ্বালানি তেলের ডিপো| এর মধ্যে ফতুল্লার ফাজেলপুর এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পাশাপাশি অবস্থিত মেঘনা ও যমুনা ডিপো| আর সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল বার্মা স্ট্যান্ড এলাকায় পদ্মা ও মেঘনা ডিপো দুটিও ¯^ল্প দূরত্বে রয়েছে|

এই চারটি ডিপো থেকে প্রতিদিন হাজারো ট্যাংক-লরীর মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে জ্বালানি তেল তথা পেট্রোল, ডিজেল, অকটেন, কেরাসিন ও ফার্নিস অয়েল সরবরাহ করা হয়ে থাকে| এমনকি বিমানে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলও সরবরাহ করা হয় সিদ্ধিরগঞ্জের জ্বালানি ডিপো থেকে|

ডিপো সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, কেবল ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ডিপোতেই নিয়মিত মজুদ থাকে অন্তত ৬ কোটি লিটার জ্বালানি তেল| তবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়া সত্বেও মহাগুরুত্বপূর্ন এই ডিপোগুলো নানা কারণেই রয়েছে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে| সরেজমিনে গেলেই চোখে পড়বে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগজনক নানা চিত্র|

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংবেদনশীল হওয়ায় ডিপোর সীমানা থেকে শুরু করে দীর্ঘ ১ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ধরনের জ্বালানি তেলের দোকান বা গোডাউন স্থাপন করা যাবে না মর্মে আইনত নির্দেশনা রয়েছে| নিরাপত্তা বিবেচনায় এমন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চারটির একটি ডিপো এলাকাতেও নেই সেই আইনের বাস্তবায়ন|

উপরন্ত প্রতিটি ডিপোর প্রায় সীমানাবর্তী স্থানেই যেন ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় গড়ে তোলা হয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ˆবধ-অবৈধ জ্বালানি তেলের সংখ্য দোকান ও গোডাউন| এসকল দোকান ও গোডাউনগুলোতে অতিরিক্ত হারে যত্রতত্র মজুদ করে রাখা হচ্ছে বিধ্বংসী জ্বালানি তেল| এতে ডিপোর বাহিরের যেকোনো ছোট দূর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের রেশও ছড়িয়ে পড়তে পারে ডিপোর ভিতরে| এমনটা হলে ম্যাসাকার হতে পারে রাষ্ট্রের মজুদকৃত গুরুত্বপূর্ন এই জ্বালানি তেলের ডিপোগুলো| যার সম্ভাব্য ভয়াবহতা ও ক্ষতির মাত্রা হতে পারে অপূরনীয়|

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফতুল্লার যমুনা ও মেঘনা ওয়েল ডিপোর আশপাশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ৩০-৩৫ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে অবস্থিত পদ্মা-মেঘনা ওয়েল ডিপোর এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত অর্ধশতাধীক জ্বালানি তেলের দোকান ও গোডাউন গড়ে উঠেছে|

এসকল তেল ব্যবসায়ীদের অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে অবৈধ কারবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ| এছাড়া জ্বালানি তেল ব্যবসার ˆবধতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ডিসির অনাপত্তিপত্র, বিস্ফোরক সনদ, পরিবেশ ছাড়পত্র ও ফায়ার সার্ভিসের সনদপত্র ছাড়াই দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই| গোদনাইলতো বটেই, ফতুল্লাতেও ˆবধ ব্যবসায়ীদের চেয়ে অবৈধদের দাপট-ই ঢের বেশী! এরা চোরা কারবারীদের কাছ থেকে চুরিকৃত জ্বালানী তেল অল্প দামে ক্রয় করে নিজ নিজ দোকানে মজুদ ও বিক্রি করার অভিযোগও নতুন হয়|

এদিকে, এসব দোকানের আশপাশেই সারিবদ্ধ ভাবে পার্কিং করা থাকে জ্বালানি তেল বহনকারী ট্যাংকারগুলো| ডিপোর দেয়াল ঘেঁষা দোকান গুলোতেও ঝুঁকিপূর্ন ভাবে যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জ্বালানী তেলের ব্যারেলগুলো| এর মধ্যেই লেবার থেকে শুরু করে অসচেতন পথচারীরা উদাসীন ও বেখেয়ালি ভাবে সেখানে ধুমপান করে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই| এতে করে যেকোনো সময়ে ডিপোর দেয়াল ঘেঁষা স্থানে অগ্নিকাণ্ডের উচ্চ-ঝুঁকির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহল| এমনটা হলে তা ডিপোর ভিতরেও যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেই শঙ্কা মোটেও অমূলক নয়| তবে ম্যাসাকার হতে পারে গোটা অঞ্চল; ঘটতে পারে বহু প্রাণহানীও|

এদিকে, ডিপোর দেয়াল ঘেঁষে জ্বালানি তেলের দোকান তো বটেই এমনকি নিয়ম বহির্ভূত ভাবে অনেকেই সংকীর্ণ দোকানের মাঝেই অতিরিক্ত হারে তেল মজুদ করে রাখছেন| জ্বালানি নিরাপত্তা আইনে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও এই বিষয়ে খুব একটা নজর দিতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে|

সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কেবল অরক্ষিত জ্বালানি তেলের অবৈধ দোকানই নয় বরং ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সময়েও সামান্য অসাবধানতা থেকে ঘটতে দুঃসহ ট্র্যাজেডি|

বছর দু’এক আগে ফতুল্লায় মেঘনা ও যমুনা ডিপোর নিকটবর্তী স্থানে ঘটেছিল এমনই এক ভয়াবহ দূর্ঘটনা| নদীপথে ট্রলার কিংবা ছোট-মাঝারি নৌযানে ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরন ও অগ্নিকাণ্ডে একটি তেল বোঝাই ট্রলারে থাকা পাঁচজন শ্রমিকের মধ্যে চার জনের ভয়াবহ প্রাণহানী ঘটেছিল| দুই ডিপোর একেবারে সন্নিকটে এই দূর্ঘটনা ঘটলেও তা নদীর তীরে নোঙর করে রাখা ভাসমান ট্রলারে হওয়ায় ভাগ্যক্রমে সেই আগুনের লেলিহান শিখায় ডিপো আক্রান্ত হয়নি| জলন্ত ট্রলারটি পানিতে ভেসে নদীর ওপারে চলে যাওয়ায় সেই যাত্রায় রক্ষা মিলেছে বটে! তবে শঙ্কা রয়েছে আজ এবং আগামীতেও|

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিনিয়তই এসকল ট্রলার কিংবা ছোট জাহাজে করে ড্রাম বোঝাই জ্বালানি তেল বহন করা হয়ে থাকে| এসকল নৌযানের শ্রমিকরা প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত না হওয়ায় দূর্ঘটনার ঝুঁকি প্রবলভাবে বিদ্যমান থাকে|

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা পোষন করে সময় নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে, বাহিরের নানা কারণেই ডিপোগুলোতে ঝুঁকি বিদ্যমান| আসলে আমাদের যেটুকু দায়িত্ব রয়েছে, তার উপরই আমরা কাজ করে থাকি| যেমন কোনো জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীর বিস্ফোরক ব্যবস্থা সঠিক আছে কিনা- তা দেখে তাকে বিস্ফোরকের সনদপত্র দেয়া| আমরা যেগুলোকে নিরাপদ মনে করি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সনদপত্র দেই| এছাড়া এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্যকোন জ্বালানী তেলের দোকান থাকবে কি থাকবে না, সেই বিষয়টা বলতে পারবে পরিবেশ অধিদপ্তর, ডিপো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসন| এই নির্দেশনাগুলো দেখার দায়িত্ব ফায়ার সার্ভিসকে দেয়া হয়নি|’

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >