নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি ও আওয়ামী শ্রমিক লীগ নেতা কালামকে গ্রেফতার করেছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ফতুল্লার দক্ষিণ সেহাচর লালখা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় একই মামলার আসামি ও কালামের ভাতিজা রাকিব পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান বলে জানা গেছে।
এর আগে একই এলাকার বাসিন্দা ও কালামের আপন ভাই পারুল হোসেন ওরফে পলাশকে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ফলে একই পরিবারের দুই সদস্য গ্রেফতার হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন পারুলের ছেলে ও কালামের ভাতিজা রাকিব।
জানা গেছে, গ্রেফতার কালাম ও পারুল হোসেন পলাশ ফতুল্লার দক্ষিণ সেহাচর লালখা এলাকার শুক্কুর মুন্সির ছেলে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের শাসনামলে পারুল হোসেন পলাশ কখনো নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শাহ নিজাম, আবার কখনো শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশের অনুসারী পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন। তার ভাই কালামও আওয়ামী শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছিলেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দুই ভাইয়ের নাম আসার পর তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এর আগে পারুল হোসেন পলাশকে গ্রেফতারের পর ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম জানিয়েছিলেন, পারুল শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে একাধিক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
চাচা গ্রেফতার, পুলিশের হাত ফসকে পালালেন রাকিব
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালামকে গ্রেফতারের সময় তার ভাতিজা রাকিব পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে রাকিবের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং পরিচালনা, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের আলোচিত আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত নাসিরের অনুসারী ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাকিব এলাকায় নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপির বলয়ে আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থানও পাল্টে ফেলেন রাকিব। একসময় আজমেরী ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিএনপির একটি বলয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাকিব আগের মতোই এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।
একই পরিবারের দুই সদস্য গ্রেফতার, অধরা রাকিব
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় প্রথমে পারুল হোসেন পলাশ এবং পরবর্তী সময়ে তার ভাই কালাম গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে একই পরিবারের তিন সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ থাকলেও রাকিব এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে হত্যা মামলার সব আসামিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাকিবের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এর আগে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব আলম জানিয়েছিলেন, হত্যা মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালামকে গ্রেফতার এবং রাকিবের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে একই পরিবারের দুই সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর পলাতক রাকিবকে গ্রেফতারে পুলিশ কতটা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।






