নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ‘১/১১’ ইস্যু। ২০০৭ সালের বহুল আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবার সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতাকে। একদিকে অভিযোগ, অন্যদিকে তীব্র প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন বেশ উত্তাল।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যেন আগুনে ঘি ঢেলেছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। বহুল আলোচিত ‘১/১১’ ইস্যুকে সামনে এনে তিনি সরাসরি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য, এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী-কে “মাস্টারমাইন্ড” আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন—যা রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে তীব্র প্রতিক্রিয়া, ক্ষোভ ও বিস্ময়।
সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু সরাসরি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী-কে ‘১/১১’-এর মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। শুধু তাই নয়, তাকে “আওয়ামী লীগের দোসর” ও “ফ্যাসিস্ট” বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি।
অভিযোগের জবাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী সরাসরি এই বক্তব্যকে “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “এসব পূর্বপরিকল্পিত। কেউ টিপুকে দিয়ে এসব বলাচ্ছে। ১/১১ বা মাইনাস টু ফর্মুলার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মিথ্যা ও বানোয়াটভাবে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে।” তিনি আরও দাবি করেন, সেই সময় দেশের ভয়াবহ অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে তিনি একজন শিল্পসংগঠক হিসেবে শান্তি ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন—যা ছিল সম্পূর্ণ দেশ ও জনগণের কল্যাণে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—আমাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১/১১-এর সময় যখন দেশ কার্যত অচল, রাহাজানি ও সহিংসতায় বিপর্যস্ত ছিল, তখন তিনি এফবিসিসিআই-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে ভূমিকা রাখেন। তার মতে, দেশের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে দায়িত্বশীল মহল থেকে শান্তির আহ্বানই ছিল সময়ের দাবি।
২০০৭ সালের ১/১১—যে দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্ধকার ও অস্থির অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত—সেই সময়ে দেশ ছিল কার্যত অচল। সহিংসতা, সংঘর্ষ, অনিশ্চয়তায় জনজীবন বিপর্যস্ত।সেই সময় ফখরুদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। তৎকালীন ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকেই দেশকে স্থিতিশীল করার আহ্বান জানান। সেই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ আলীর নাম টেনে এনে তাকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বানানো—অনেকের কাছেই “হাস্যকর” ও “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”। এদিকে মোহাম্মদ আলীর ভূমিকাকে তার সমর্থকরা “দায়িত্বশীল” হিসেবেই তুলে ধরছেন, ষড়যন্ত্র নয়।
রাজনৈতিক মহলে এখন আরেকটি প্রশ্ন জোরালোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে—অভিযোগকারী নিজেই কতটা নিরপেক্ষ?
অভিযোগ উঠেছে, আবু আল ইউসুফ খান টিপু অতীতে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছেন। এমনকি স্থানীয় রাজনীতিতে একাধিক বিতর্কিত অবস্থানেও তাকে দেখা গেছে বলে দাবি করছেন সমালোচকরা। কেউ কেউ বলছেন, আবু আল ইউসুফ খান টিপু বিভিন্ন সময়ে অবস্থান বদল করে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

নারায়ণগঞ্জ রাজনীতিতে গিরিগিটি তকমা পাওয়া টিপুকে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে আওয়ামীলগের ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তিত্বের সাথে। নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনুর সাথে তাকে বেশ কয়েকবার দেখা গিয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে। যেই টিপু নিজেই আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এবং যিনি নিজেই আওয়ামীলীগের ব্যাক্তি বর্গের সাথে কাটিয়েছেন সময় সেই টিপুই কিভাবে একজন সম্মানিত বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এমন ন্যাক্কারজনক আখ্যায় আখ্যায়িত করতে পারে তা সত্যিই বিস্ময়কর ।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার ও গণমাধ্যমে আলোচনার শীর্ষে থাকার জন্যই এমন বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। একটি পদকে কেন্দ্র করে নিজের অবস্থান শক্ত করতে গিয়ে কি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধাকে টার্গেট করা হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন জনমনে। এটি কেবল মতবিরোধ নয়—বরং পরিকল্পিত চরিত্রহননের একটি কৌশল। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—“রাজনীতির নামে এই নোংরা খেলায় শেষ কোথায়?”








