নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অন্যতম এক মুখ মো. কামরুল ইসলাম। অভ্যন্তরীন সূত্রগুলো বলছে, জেলা নাজিরের গুরুত্বপূর্ন এই পদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার পাশাপাশি সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। অত্যন্ত কর্মঠ ও কর্তব্যপরায়ণ এই সরকারী কর্মচারি সেবাগ্রহীতাদের কাছে সদা হাস্যোজ্বল এবং বিনয়ী ব্যক্তি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়াও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা পালনে যতটা তৎপর, অধিনস্থদের প্রতিও ঠিক ততটাই দায়িত্বশীল ও আস্থাভাজন তিনি। ফলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিশেষ কদর রয়েছে নাজির কামরুল ইসলামের। তবে এসকল কর্মগুণ ও খ্যাতিই যেন কাল হতে শুরু করেছে তার জন্য।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যালয়ের ভিতর ও বাহিরের একটি পক্ষ পেছন থেকে নানা কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছে কামরুল নাজিরের বিরুদ্ধে। তাকে বিতর্কে বিদ্ধ করতে অদৃশ্য এক মিশনে নেমেছে। ইতিমধ্যেই তাকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর তকমা দিতে সচেষ্ট হয়েছে ওই পক্ষটি।
জানা গেছে, সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করাটা নিয়মিত কাজেরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে নাজির কামরুল ইসলামের জন্য। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেমনটা ছিলো, তেমনটা ছিলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এবং বিএনপির শাসনামলেও চলছে এমনটাই।
এসকল রাষ্ট্রিয় আচার অনুষ্ঠানে সরকারী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অংশ নিয়ে থাকেন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরাও। ফলে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের সাথে বিভিন্ন সময়ে ক্যামেরা-বন্দিও হয়ে থাকেন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। তেমনটা হয়েছে নাজির কামরুল ইসলামের বেলাতেও। তবে সেসকল আচার-অনুষ্ঠানের ছবির ভিত্তিতে কামরুলকে পতিত আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যায়িত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তার বিরোধী একটি পক্ষ। এমনকি তাকে ভূমিদস্যু হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেইজে।
নাম সর্বশ্ব একটি ফেসবুক পেইজে (মূল ধারার গণমাধ্যম নয়) নাজির কামরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের ভূমিদস্যু আখ্যায়িত ও আওয়ামী দোসর তকমা দিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অসম্পন্ন একটি ভিডিও কন্টেন্টে উল্লেখ করা হয় বন্দরে আমিরুল ইসলাম ও তার পুত্র আরিফের জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে অভিযোগকারী ওই পিতা-পুত্রের বিষয়ে খোঁজ নিতেই বেড়িয়ে আসে ভিন্ন এক চিত্র।
নাম সর্বশ্ব কথিত ওই গণমাধ্যমে নাজির কামরুল ইসলামকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ্য করা হলেও প্রকৃত পক্ষে ভিডিও কন্টেন্টটিতে যাদের পক্ষ নেয়া হয়েছে, সেই পিতা-পুত্রই হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠন তরুন প্রজন্ম লীগের পদধারী দায়িত্বশীল নেতা। এরমধ্যে আমিরুল ইসলাম বন্দরের স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তার ছেলে আরিফ বন্দর উপজেলা তরুণ প্রজন্ম লীগের সভাপতি পদে আছেন।
তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও হামলার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়াও বন্দর সহ বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় আরও একাধিক মামলার তথ্য প্রমাণ হাতে এসেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বন্দরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিএম স্কুল এন্ড কলেজের কোটি টাকা লোপাট দূর্নীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো। তৎকালিন সময়ে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সেই দূর্নীতির ফিরিস্তি উঠে এসেছিল।
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ভূয়া দলিল ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা জাহির করে বিএম স্কুল এন্ড কলেজের কাছে প্রায় ২৩ শতাংশ জমি বিক্রির মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল আমিরুল ইসলাম। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তার। ভূমি অফিস ও বন্দর থানা পুলিশের তদন্তে আওয়ামী লীগ নেতা আমিরুল ইসলামের জাল-জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস ও থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসে। বিষয়টি গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হওয়ার পর তৎকালিন এমপি সেলিম ওসমানের কঠোর আল্টিমেটাম ও তদন্ত কমিটির হস্তক্ষেপে ৪ দিনের মাথায় আত্মসাৎকৃত ওই জমির মূল্যের কোটি টাকার চেক ফিরিয়ে দিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতা আমিরুল।
আওয়ামী লীগের এই অসাধু পক্ষটি এবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নাজির কামরুল ইসলামকে ঘায়েল করতে তৎপর হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন কামরুল ইসলাম নিজেই।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সরকারের একজন ক্ষুদ্র কর্মচারী হিসেবে এটুকু বলতে চাই যে, আমি আইনের প্রতি শতভাগ শ্রদ্ধাশীল। আইনি প্রক্রিয়াকেই আমি সম্মান করি এবং নাগরিক হিসেবে আস্থা খুঁজে পাই। আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচার করা হচ্ছে। আমি এসবে মোটেও বিচলিত নই। কারণ আমি জানি যে, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র যতই বড় হোক না কেন, দিন শেষে সত্যেরই জয় হয়ে থাকে। আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে যেই বানোয়াট তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা কোনো ভাবেই সঠিক নয়।’
উল্লেখ্য, তরুণ লীগ নেতা আরিফের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বেশ কয়েকটি মামলার তথ্য-প্রমাণ হাতে এসেছে। এখনো পর্যন্ত হাতে আসা মামলাগুলোর নথিপত্র অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্ম লীগ নেতা আরিফের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় ধারা ১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩৭৯/৫০৬ ধারায় মামলা রয়েছে। যার এফআইআর নং-৫৪/১৭৮, তারিখ- ২৪/১০/২০১৮ইং। এই মামলায় এজাহারভুক্ত অন্যতম আসামী হলেন আরিফ।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বন্দর থানায় ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৬/৩৭৯/৫০৬ ধারায় আরও একটি মামলার তথ্য-প্রমাণ হাতে এসেছে। যার এফআইআর নং-১৩, তারিখ- ১০/০৩/২০১০ইং। এ মামলাতেও আরিফ এজাহারভুক্ত আসামী।
অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনাতেও আরিফের বিরুদ্ধে মামলার নথিপত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানায় ১১৪/১৪৭/১৪৮/১০৯/৩০২/৩৪ ধারার একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামী হলো এই আরিফ। মামলার এফআইআর নং-৪৩, তারিখ ১৫/১১/২০২৫, এবং জিআর মামলা নং-১০২৩, তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০২৫।
সূত্রগুলো বলছে, এসকল নথিপত্রের বাহিরেও আরিফ ও তার পিতা আওয়ামী লীগ নেতা আমীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। একই সাথে জাল-জালিয়াতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় ইতিপূর্বে দায়ের করা হয়েছে একাধিক অভিযোগও।
এদিকে, এসকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে আওয়ামী লীগ নেতা আমীরুল ইসলাম ও তার ছেলে তরুন প্রজন্ম লীগ নেতা আরিফের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




