নারায়ণগঞ্জ ।
,

স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা কে জিতবে ফাইনালে?

চার বছর আগে কাতারের লুসাইলে ইতিহাস লিখেছিল আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির হাতে উঠেছিল বহুলপ্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ। এবার নিউ ইয়র্কের ফাইনালে তাদের সামনে আরেকটি ইতিহাসের হাতছানি। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। কিন্তু অদ্ভুত এক বাস্তবতা হলো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েও ফাইনালে ফেভারিট নয় আর্জেন্টিনা।

বেশির ভাগ বিশ্লেষক, পরিসংখ্যানবিদ এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চোখে এগিয়ে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। কারণ শুধু একটি নয়; টুর্নামেন্টজুড়ে তাদের ভারসাম্য, লড়াকু স্কোয়াড, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং লামিনে ইয়ামালের মতো বিস্ফোরক প্রতিভা। তবু ফুটবল কেবল খাতা-কলমের হিসাব মানে না। কারণ আর্জেন্টিনার দলে আছেন একজন লিওনেল মেসি।

কেন এগিয়ে স্পেন? বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার ছিল স্পেন। যদিও টুর্নামেন্টের মাঝপথে ফ্রান্সের দুর্দান্ত আক্রমণভাগ দেখে অনেকেই এমবাপ্পেদের এগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেমিফাইনালে সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, অলিসে, বারকোলাদের মতো তারকায় ঠাসা ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে স্পেন দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের আসল শক্তি কোনো একক তারকা নয়—পুরো দল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত ড্রয়ের পর যে দলকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে হারিয়ে সেই দলই এখন সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী।

দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় সাফল্য এই স্পেন আসলে কোনো এক ক্লাবের দল নয়। বার্সেলোনার আটজন খেলোয়াড় আছেন, আবার রদ্রি ম্যানচেস্টার সিটির, ফ্যাবিয়ান রুইজ পিএসজির, অ্যালেক্স বায়েনা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের, মিকেল ওয়ারজাবাল রিয়াল সোসিয়েদাদের। বিশ্বকাপের আগে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে বিশ্বের সেরা দল স্পেন জাতীয় দল। খেলোয়াড় কোথা থেকে এসেছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে যেন স্পেনের হয়ে খেলতে গর্ববোধ করে।’ এই দর্শনই এখন স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মাঝমাঠেই ফাইনালের ভাগ্য? ফাইনালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হতে পারে মাঝমাঠে। স্পেনের রদ্রি ও ফ্যাবিয়ান রুইজ বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের সামনে দানি ওলমো জায়গা তৈরি করেন। দুই পাশে ইয়ামাল ও বায়েনা প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরান। আর সামনে আছেন পাঁচ গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে এই চারজনের সমন্বয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে এমবাপ্পেরা পুরো ম্যাচেই ছন্দ খুঁজে পাননি। তাই ফাইনালেও মাঝমাঠেই নির্ধারিত হতে পারে ট্রফি জয়ের ভাগ্য।

আর্জেন্টিনার অস্ত্র—মেসি ৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি যেন সময়কে হার মানিয়ে খেলছেন। ইতোমধ্যে আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে পুরো ম্যাচে খুব বেশি চোখে না পড়লেও শেষ কয়েক মিনিটেই বদলে দেন সবকিছু। প্রথমে এনজো ফার্নান্দেজকে দিয়ে সমতার গোল করান। এরপর যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্টিনেজের জয়সূচক গোলেও ছিল তার নিখুঁত অ্যাসিস্ট।

ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত নিস্তব্ধ থাকা একজন খেলোয়াড় কীভাবে শেষ পাঁচ মিনিটে পুরো ম্যাচের গল্প বদলে দিতে পারেন মেসি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ফাইনালেও আর্জেন্টিনার বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন মেসি।

ইংল্যান্ডের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে স্পেন

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর পুরো দলকে নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে নেওয়া। পুরোপুরি লো-ব্যাক ডিফেন্সে চলে আসা। টমাস টুখেলের এই রক্ষণাত্মক সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। বল দখল, আক্রমণ, চাপ—সবই চলে যায় স্কালোনির দলের হাতে। স্পেনের ক্ষেত্রে সেই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। দে লা ফুয়েন্তের দর্শনই হলো—রক্ষণ নয়, বলের নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা। তাই বলও নিজেদের কাছেই রাখতে চাইবে স্পেন।

আর্জেন্টিনার রক্ষণ কি টিকবে? লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার গ্যারি নেভিল একবার তাদের বলেছিলেন, ‘বিশ্বের সেরা, আবার সবচেয়ে খারাপ সেন্টার-ব্যাক জুটি।’ সমালোচনা থাকলেও বড় ম্যাচে এই জুটিই বারবার নিজেদের প্রমাণও করেছে। ফাইনালেও তাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে লামিন ইয়ামাল ও ওয়ারজাবালকে থামানো। দেখা যাক রক্ষণ টিকে কি না?

দুই প্রজন্মের লড়াই এই ফাইনাল শুধু দুটি দেশের নয়। এটি যেন দুই যুগেরও লড়াই। এক পাশে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, যার ক্যারিয়ারের হয়তো শেষ বিশ্বকাপ। অন্য পাশে বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজপুত্র, যে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। একজন মেসি। অন্যজন লামিন ইয়ামাল।

আগামীকাল রাতে নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির আলো ঝলমলে স্টেডিয়ামে হয়তো শুধু একটি ট্রফির মালিকই নির্ধারিত হবে না। ফুটবল বিশ্বের ভবিষ্যৎ গল্পেরও একটি নতুন অধ্যায় লেখা হবে। এর আগে প্রশ্ন একটাই—বিশ্বকাপ কি আরো একবার মাথা নত করবে মেসির সামনে, নাকি শুরু হবে ইয়ামালের নতুন সাম্রাজ্য?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >