নারায়ণগঞ্জ । বুধবার
২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কড়াইল বস্তিতে আর্তনাদ, সব হারিয়ে নিঃস্ব বস্তিবাসী

রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে রাতে এক মুহূর্তে সব হারিয়ে দেড় হাজারেরও বেশি পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে নিঃস্ব হয়ে পড়ে আছে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, সঞ্চয়, দোকান—সবকিছু হারিয়ে লোকজনের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।

মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘিঞ্জি কড়াইল বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে টিন-বাঁশের সারি ঘরজুড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট প্রায় পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও তার আগেই ভস্মীভূত হয়ে যায় বস্তির বৃহৎ অংশ। রাত নামতেই শত শত মানুষ বাধ্য হয় রাস্তার পাশে ও খোলা মাঠে রাত কাটাতে।

“শুধু গায়ের কাপড়টাই আছে” এমন বক্তব্যে সাত বছর ধরে কড়াইলে বসবাস করা লাভলী বেগম দগ্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন এখানে যা ছিল, সব আগুন নিয়ে গেছে। কিস্তিতে আনা জিনিসপত্র, বাচ্চাদের কাপড়, সঞ্চয়ের টাকা কিছুই রইল না। এখন রাত হলে কোথায় যাব? তার স্বামী ভ্যানচালক মোহসিন আলী বলেন, ঘরে আগুন লেগেছে শুনে ছুটে এসেছি। কিন্তু কিছুই বাঁচাতে পারিনি। সব শেষ। এখন বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় থাকব ভাবতেই মাথা ঘুরে যায়।”

মাস দুই আগে বস্তিতে থাকা শুরু করা দিনমজুর শামসুল ইসলাম চোখ মুছতে মুছতে জানান, আগুন এত দ্রুত ছড়ায় যে কিছুই বের করতে পারিনি। চারদিক ধোঁয়া আর আগুনে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বাচ্চারা রাতে খামারবাড়ির মাঠে ফুফুর সঙ্গে শুয়ে থেকেছে।”

বৌবাজার ক-ব্লকে গিয়ে দেখা যায়, কালো হয়ে যাওয়া টিন, বাঁশ আর ভস্মীভূত সামগ্রীর স্তূপের পাশে অসহায় মানুষের সারি। তাদের চোখেমুখে হাহাকার আর নিঃস্বতার গভীরতা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন,“আমার গায়ের কাপড় ছাড়া আর কিছু নাই। ছোট্ট দোকান চালাতাম দোকানের পয়সা, টিভি-ফ্রিজ, বাচ্চাদের সার্টিফিকেট সব আগুনে শেষ। এখন কীভাবে চলব?

বৃদ্ধা রহিমা বেগম বলেন, ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা জমাইছিলাম। টিনের বাক্সে ছিল। আগুনে সব শেষ। আজও না খেয়ে আছি। সরকারের সাহায্য দরকার।”

অগ্নিকাণ্ডের পর আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এবং কয়েকটি সামাজিক সংগঠন খাবার ও পানি সরবরাহের চেষ্টা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, দুই হাজারের মতো মানুষ রাতে রাস্তার পাশে, খোলা মাঠে ছিল। কিছু রাজনৈতিক দলের কর্মী আর সংগঠন খাবার-পানি দিয়েছে, কিন্তু এত মানুষের জন্য তা সামান্যই।”

এই অগ্নিকাণ্ড আবারও কড়া ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিল নগরীর অরক্ষিত বাস্তবতার কথা। নগরীর বস্তিগুলো কতটা অরক্ষিত, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ঘিঞ্জি বসতি, সংকীর্ণ রাস্তা, পর্যাপ্ত পানি-সংযোগের অভাব এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হচ্ছে বারবার।

এখন হাজারো মানুষ অপেক্ষা করছে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের। পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের ভস্ম স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের একটাই প্রশ্ন “এখন আমরা কোথায় যাব?”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >