ঠিক যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন হালের আলোচিত-সমালোচিত নব্য বিএনপি নেতা মাসুদুজ্জামান ওরফে মডেল মাসুদ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্ব লুফে নেয়ার মাধ্যমে আলোচনায় আসা মডেল মাসুদ ইতিপূর্বে ছিলেন সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ক্যান্টনম্যান্ট খ্যাত ওসমান পরিবারের সাথে মডেল মাসুদের দহরম মহরম সম্পর্কের কথা কারই যেন অজানা নয়। বিএনপির নেতারা যখন আওয়ামী নির্যাতনের খরগে নিমজ্জিত ছিলেন, তখন মডেল মাসুদকে দেখা গেছে সেলিম ওসমানের পাশে খোশ মেজাজে। মাঠের আন্দোলন তো দূরের কথা নিজের এসি রুমে বসেও বিএনপির জন্য টু শব্দ টুকু না করা এই মডেল মাসুদ এখন বড় বিএনপি নেতা বনে গেছেন! দুই হাতে টাকার ছড়াছড়ি করে নিজের বলয়ে বিএনপির দলছুট কিছু নেতাকর্মীকে বশে এনেছেন বটে, তবে পরোক্ষ ভাবে বিএনপির কফিনে পেড়েক ঠুকছেন একের পর এক। নিজেকে বিএনপি নেতা বললেও শুরু থেকে তিনি বিএনপিকে কলুষিত করে যাচ্ছেন একের পর এক অভিযোগের মাধ্যমে।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর চেম্বার অব কমার্সের নেতৃত্বে এসে মডেল মাসুদ সংবাদ সম্মেলন করে বলে ছিলেন, বিএনপির এক নেতা চেম্বার ও বিকেএমইএ থেকে চাঁদা নিয়েছেন। তিনি সেই নেতার নাম প্রকাশ না করলেও পরবর্তীতে জানিয়েছেন, সেই নেতা নাকি চাঁদার টাকা ফেরত দিয়েছেন। মডেল মাসুদের এই বক্তব্যকে নিছক স্ট্যান্টবাজী হিসেবে দেখছেন বিএনপি নেতারা।
অন্যদিকে, সম্প্রতি আরও একটি সংবাদ সম্মেলন করে মডেল মাসুদ দাবি করেন, বিএনপির একটি ঐহিত্যবাহী পরিবার তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলার প্লট সাজিয়ে তাকে হেয় করতে চাইছে। এর জন্য নাকি ৩০ লাখ টাকাও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যদিও কে সেই বিএনপি নেতা বা কোন সেই পরিবার তা প্রকাশ করেননি মডেল মাসুদ। তার এই বক্তব্যকেও স্ট্যান্টবাজী হিসেবে দেখছেন অনেকে। কেউ কেউ বলছেন, মডেল মাসুদ ভিন্ন কোনো পক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিএনপিকে কলুষিত করার মিশনে নেমেছেন।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আবুল কাউসার আশা বলেন, ‘বিএনপির বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল হচ্ছে। আমাদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। মাসুদ সাহেব অভিযোগ তুললেও কারো নাম মেনশন না করে বিএনপিকে জড়িয়ে দিচ্ছেন। তার বক্তব্যে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তার কাছে তথ্য থাকলে সরাসরি নাম মেনশন করুক। কিন্তু দলের বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদেরও কথা আছে, আমরাও কথা বলবো। এর আগেও তিনি বিএনপিকে কলুষিত করে বক্তব্য রেখেছিলেন।’
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ‘মডেল মাসুদ মহানগর বিএনপির ব্যানারে যে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছেন, তা দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গত ২২ সেপ্টেম্বর মাসুদ বিএনপির কর্মী হিসেবে যোগদান করেছেন। তাকে নিয়ম নীতি মেনে মহানগরের নেতৃত্বে চলার কথা বললেও আদৌ সে সেটা করে নাই। এখনো সে আমাদের সাথে বসে এক কাপ চাও খায়নি। সে যোগদান করেই দলের অভিভাবক সাজতে চায়। সাখাওয়াত-টিপুকে ভাঙ্গতে চায়। উনি বলেছেন বিএনপির এক রাজনৈতিক পরিবার তার বিরুদ্ধে অপবাদ দিচ্ছে। আমার কথা হলো তাহলে উনি নাম বলছেন না কেনো। আমরাও জানতে চাই সেই পরিবারটা কারা। এটা আসলে জনগণের সিম্পেথি পাওয়ার জন্য তার অভিনব কৌশল ও স্ট্যান্টবাজী। উনি যাদের নিয়ে আছেন তারা কেউ ওসমান পরিবারের দালাল, কেউ পকেট মারের সন্তান, কেউ গ্যাস চোর আবার কেউ খিচুড়ি রান্নার কথা বলে খালি ডেগের ছবি তুলে দেখিয়েছে। ভাত ছিটাইলে কাউয়ার অভাব হয়না, তাই টাকা দিয়ে আপনি ত্যাগি নেতা তৈরী করতে পারবেন না।’
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সময় নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘তিনি ১৫ দিনের রাজনীতিতে নিজেকে ভবিষ্যতের এমপি ভাবতে শুরু করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যাচ্ছেন। গত ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপিতে এমন অজস্র নতুন কর্মী যোগদান করেছেন। কিন্তু তিনি সদ্য বিএনপিতে যোগদান করে নিজেকে বিএনপির বড় নেতা ভাবতে শুরু করেছেন। আমরা বিগত ১৬ বছর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক এমনকি পেশাগত জীবনসহ সর্বক্ষেত্রেই নির্যাতিত হয়েছি। জেল খেটেছি, হামলার শিকার হয়েছি। নিজের সন্তানও গুমের শিকার হয়েছে। এরপরও আন্দোলন সংগ্রাম বা রাজপথ থেকে কখনই পিছ-পা হইনি। কিন্তু এই ১৬ বছর মডেল মাসুদকে রাজপথে তো দূরের কথা বিএনপির জন্য তার এসি রুমে বসেও একটি শব্দ করতে শুনিনি। এখন বিএনপির সুদিনের হাতছানি দেখে তিনি উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। তিনি ১৫ দিন হলো বিএনপিতে নতুন যোগদান করে এখনই নিজেকে বড় নেতা সহ নানান কিছু মনে করছেন। এমন সদস্য ফরম তো সারা দেশে কয়েক লাখ মানুষ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু তিনি সুদিনের সম্ভাবনা দেখে বিএনপিতে যোগদান করেই ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের নিয়ে বিষোদগার করে বেড়াচ্ছেন। দলে ভাঙ্গন ধরাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করছেন। এটা তার কোনো দুর্বিসন্ধি হবে বলে আমি মনে করি।’








