বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদের গোমর ফাঁস করেছেন আলোচিত সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়ের খান সামি। গত সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতে জুলকারনাইন সায়ের তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিতে একটি পোষ্টের মাধ্যমে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম আজাদের একাধিক বিলাশ বহুল গাড়ী ব্যবহারের নেপথ্যে থাকা ‘গোপন রহস্য’ জনসম্মূখে ফাঁস করেন। একই সাথে গাড়ীগুলোর ছবিও ওই ফেসবুক পোস্টে আপলোড করেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রেখে যাওয়া এই প্রবাসী সাংবাদিক।
তার পোস্ট থেকে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম আজাদের ব্যবহৃত বিলাশ বহুল ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার গাড়িটি আওয়ামী লীগের সাবেক ভূমিমন্ত্রী (বর্তমানে পলাতক) সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিতর্কিত সাইফ পাওয়ার গ্রপের প্রতিষ্ঠান সাইফ পোর্ট হোল্ডিংস এর নামে রেজিস্ট্রেশন করা।
অন্যদিকে, তার আরেক বিলাশ বহুল গাড়ী ‘মার্সিডিজ জি ওয়াগন’টি কেমা ট্রেডিং এবং বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হক এমপি এর নামে নিবন্ধিত।
জুলকারনাইন সায়ের তার ফেসবুকে পোস্ট করার সাথে সাথেই বিষয়টি নেটিজেনটের মাঝে ব্যপক ভাবে ছড়িয়ে পরে। এতে নেটিজেন ছাড়াও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ তো বটেই; এমনকি দেশ ছাপিয়ে দেশের বাহিরে থাকা রাজনৈতিক ও অন্যান্য মহলগুলোতে নজরুল ইসলাম আজাদকে নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। পোস্টের কমেন্ট বক্সে নজরুল ইসলাম আজাদকে নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা যায় অসংখ্য মানুষকে।
জুলকারনাইন সায়ের খান সামি একজন যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক নির্বাসিত বাংলাদেশী সাংবাদিক। তিনি আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল জাজিরার তদন্তকারী ইউনিটের একজন সদস্য। পাশাপাশি অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন প্রজেক্ট রিপোর্টিং এর একজন গবেষক তিনি।
গত সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ৪ মিনিটে জুলকারনাইন সায়ের খান সামি তার ফেসবুক পোস্টটি আপলোড করেন।
পাঠকদের জন্য ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো; “বিভিন্ন নামীদামী ব্রান্ডের গাড়ি ব্যবহারে নজরুল ইসলাম আজাদ (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক) এর জুড়ি মেলা ভার। নেতা মানুষ তিনি দামি গাড়িতে চড়তেই পারেন, তবে এই গাড়িগুলোর একটিও তাঁর নিজস্ব নয়।
সংযুক্ত ছবির সবগুলো গাড়িই আজাদ ব্যবহার করেন— এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর মধ্যে তিনটি গাড়ি কোন রকমের রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই (শো-রুম/গ্যারেজ) এর নম্বর ব্যবহার করে চলছে, যা নিয়মবহির্ভূত। ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার গাড়িটি যমুনা ইলেকট্রনিক্স এন্ড অটোমোবাঃ এর নামে রেজিস্ট্রেশন করা, ল্যান্ড রোভার রেঞ্জ রোভার গাড়িটি বিতর্কিত সাইফ পাওয়ার গ্রপের প্রতিষ্ঠান সাইফ পোর্ট হোল্ডিংস এর নামে রেজিস্টার্ড। উল্লেখ্য গতকাল সাইফ পাওয়ার থেকে ৪১.৭৫ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ ও আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমীলাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আর মার্সিডিজ জি ওয়াগনটি কেমা ট্রেডিং এবং বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হক এমপি এর নামে নিবন্ধিত।
প্রশ্ন হলো, একজন রাজনীতিবিদ, যিনি সাধারণ মানুষের জন্যে রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন, তিনি কিভাবে এসব কোটি-কোটি টাকা মূল্যের গাড়িতে যাতায়াত করে তাঁদের কাছে পৌঁছাবেন? আর তাঁর আয়ের প্রকৃত উৎসই বা কি? এবং কেন বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং গাড়ির শো-রুম তাঁকে এসব মূল্যবান সব গাড়ি সরবরাহ করবে এবং তাঁর এসব ব্যবহার ঠিক কতটা নৈতিক?”
আলোচিত এই পোস্টটিতে নজরুল ইসলাম আজাদের ব্যবহার করা আরও বেশ কয়েকটি বিলাশ বহুল গাড়ীর বিস্তারিত তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে নজরুল ইসলাম আজাদ তার নামে রেজিস্ট্রিশন নেই এমন আরও বেশ কয়েকটি গাড়ী ব্যবহার করছেন। যার অনেক গুলোর আবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মেয়াদ নেই। বিআরটিএ’র আইন অনুযায়ী এসকল গাড়ী ব্যবহার বা সড়কে চলাচল করা বৈআইনী তথা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে, আলোচিত এই পোস্টে আজাদের এই বিলাশ বহুল গাড়ী, আলিশান জীবন যাপন, সম্পদ ও আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই বিষয়ে নজরুল ইসলাম আজাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘আজাদ বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক পদে থাকা কালিন সময় থেকেই নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ‘ধনী’ বিএনপি নেতাদেরকে পদ বাগিয়ে দেয়ার কথা বলে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অনেকেই তাকে ‘পদ বেপারী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আর্থিক অবস্থান সম্পন্ন বিভিন্ন নেতাদের পদ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও স্থানীয় ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও প্রচলিত আছে। তাছাড়া, বিগত বেশ কয়েক বছর পূর্বে সোনারগাঁয়ের বিএনপি নেতা আজহারুল ইসলাম মান্নানকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার চেক নেয়ার বিষয়েও খবর প্রকাশ হয়েছিল গণমাধ্যমে। পদ বাণিজ্যের কারণে নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হওয়ার মত ন্যাক্কার জনক অতীত রয়েছে আজাদের।
তথ্য মতে, কয়েক বছর পূর্বে আড়াইহাজার উপজেলা যুবদলের তৎকালিন আহবায়ক জুয়েল আহমেদের বাড়িতে আজাদের উপর হামলা চালিয়েছিল স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এসময় আজাদের গাড়ি ভাংচুরসহ একটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছিল বিক্ষুব্ধরা।
বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এর আগেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩৯ তম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্থানীয় পাওনাদারদের হামলার শিকার হন নজরুল ইসলাম আজাদ। বিএনপির এমন চরম দু:সময়ে রাজনীতির নামে পদ বাণিজ্যের দোকান খুলে বসা আজাদকে আড়াইহাজার বিএনপি থেকে বিতারিত করার শ্লোগাণে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে স্থানীয় কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছিল।
প্রবীন নেতারা বলছেন, এক সময়ে বিএনপিতে যারা তারেক রহমানের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি, তাদেরই একজন ছিলেন এই নজরুল ইসলাম আজাদ। তিনি তারেক রহমান বিরোধী বলয়ের নেতা মোসাদ্দেক হোসেন ফালু এবং তারেক রহমানের প্রয়াত ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সর্মিলা রহমান সিঁথির অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপির নেতৃত্ব তারেক রহমানের কাঁধে উঠুক তা সর্মিলা রহমান সিঁথি এবং ফালু সহ নজরুল ইসলাম আজাদ এবং তাদের বলয় কখনই চাননি বলে বিএনপি অঙ্গণে কথিত আছে। তবে শেষ পর্যন্ত যখন তারেক রহমানই বিএনপির হাল ধরেছেন, তখন বিএনপিতে টিকে থাকতে আনুগত্যের বিকল্প না থাকার বাস্তবতায় নজরুল ইসলাম আজাদ তারেক রহমানের প্রতি মুখে আনুগত্য প্রকাশ করে যাচ্ছেন। তবে বিএনপিতে তিনি এখনো নিজস্ব বলয় তৈরীর সংকল্পে রয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের সাতে কথা বলে জানা গেছে, আড়াইহাজরের বাসিন্দা হলেও নজরুল ইসলাম তালুবন্দি করতে মরিয়া গোটা নারায়ণগঞ্জ বিএনপি এবং অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরীর নেপথ্যে রয়েছে আজাদের কূটচাল। বিএনপির রাজনীতিতে গ্রুপিং সৃষ্টি করে দলকে তার কুক্ষিগত করার মাধ্যমে দূর্বল করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। জেলা থেকে শুরু করে মহানগর বিএনপি এবং যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলসহ অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনেও তা পরিলক্ষিত। বিএনপির মধ্যে আলাদা বলয় এবং সত্বা তৈরী করতে বিভিন্ন কমিটির সুবিধাভোগী কিছু নেতাকে ইতিমধ্যেই বশীভুত করেছেন তিনি। আজাদের বশীভুত নেতারা নিজ দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে অস্থিরতা তৈরী করে যাচ্ছেন বলে বিএনপির ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ।








