বাংলাদেশে গত মে মাসে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও নির্যাতনের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্ট (বিএজে) প্রকাশিত মে মাসের মাসিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, গত এক মাসে অন্তত ৫৫ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হুমকিসহ বিভিন্ন ধরনের নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।
সোমবার (১ জুন) বিএজে এর গবেষণা ও মনিটরিং সেলের সম্পাদক মাহমুদুল হাছান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বিএজে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি, গ্রেফতার এবং জীবননাশের হুমকির মতো নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। এই এক মাসে ২১টি পৃথক হামলার ঘটনায় ৩৮ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে ও হামলায় আহত হয়েছেন চারজন। এছাড়াও ১০ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন এবং আট জন সাংবাদিক হুমকি ও পেশাগত কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
প্রতিবেদনে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের পেছনে একাধিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদক ব্যবসায়ী, ঠিকাদার এবং হাসপাতাল কর্মীদের হাতে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হয়েছেন।
বিএনপি, যুবলীগ ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ-সংগঠনের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের হাতেও সংবাদকর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন। এক মাসে ২১টি পৃথক ঘটনায় ৩৮ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
একই সময়ে ১০ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এতে বলা হয়, টেকনাফে মাদক ব্যবসায়ীদের প্ররোচনায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এছাড়া ভোলার এক বিএনপি নেতা সাত জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা দায়ের করেন। এ সময়ে দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এ সময়ে পেশাগত কাজে আট সাংবাদিক বাধা ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। জানানো হয়, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এক সাংবাদিককে বিদেশ যাত্রায় বাধা দেয়। মগবাজারে এক সাংবাদিককে অপহরণের চেষ্টা চালানো হয়। সিংগাইরে দুই সাংবাদিককে মামলা ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। এছাড়া বনভূমি নিয়ে সংবাদ করায় বন কর্মকর্তা এক সাংবাদিককে মামলা ও হয়রানির হুমকি দেয়।
এ সময়ে উত্তরার দিয়াবাড়ি কোরবানির পশু বিক্রির হাটের অনিয়মের সংবাদ করায় ইজারাদার এক সাংবাদিককে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এছাড়া ফরিদপুরে ঠিকাদারের অনিয়ম তুলে ধরায় এক সাংবাদিককে হত্যার হুমকি ও মারধর করেন ঠিকাদার। নোয়াখালীতে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে করা মানববন্ধনের সংবাদ কাভারেজ দেওয়ায় এক সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেন এক যুবদল নেতা। প্রতিবেদনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিএজে মনে করে, সাংবাদিকের আক্রান্ত হওয়ার এ দীর্ঘ তালিকা কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি দেশে স্বাধীন সাংবাদিকতায় ওপর এক বড় আঘাত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় না আনা হলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই বিএজে সাংবাদিকদের ওপর চলমান এই ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে।







