নারায়ণগঞ্জ । সোমবার
৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ,
২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভর্তুকী মূল্যের সার নিয়ে শেখ ব্রাদার্সের গভীর সিন্ডিকেট!

খাদ্য-শষ্য উৎপাদনে কৃষকদের মূল ভরসা ‘সার’। এই সারের বাজারেই তৈরী করা হচ্ছে কৃত্তিম সংকট। কতিপয় সার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের পুঁজিবাদী নীতির কারণে কৃষি খাতে বিরুপ প্রভাব পড়ছে দীর্ঘদিন ধরেই। মজুদ করে রাখায় একাধারে সারের সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় ফসল উৎপাদন খরচ মেটাতে নাভিশ্বাস উঠছে কৃষকদের।


অন্যদিকে, সরকার ভর্তুকী মূল্যে সার সরবরাহ করলেও মিলছে না প্রতিকার। উপরন্ত কারসাজির মাধ্যমে প্রতিনিয়তই সারের বাজার নিয়ন্ত্রন করে চলেছে একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এর সাথে জড়িয়ে আছে নদীবন্দর কর্তৃপকক্ষ সহ ঘাট ইজারাদার মহলটিও। প্রথমিক অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের থলের বিড়াল বেড়িয়ে এসেছে।


জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা ও আশপাশের প্রায় ২০টি জেলার জন্য জাহাজ যোগে প্রয়োজনীয় সার আসে তিনটি জায়গায়। এগুলো হলো, নারায়ণগঞ্জের লঞ্চ টার্মিনাল সংলগ্ন সার ঘাট, ফতুল্লার আলীগঞ্জ এবং অপরটি হলো নারায়ণগঞ্জের সীমানা সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকার সার ঘাটে।


এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ৫নং ঘাট সংলগ্ন সার ঘাটে আনলোড হওয়া সরকারের ভর্তুকী মূল্যের সার নিয়ে কারসাজী করার অভিযোগ সহ নানা তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে শেখ ব্রাদার্স কোম্পানী এবং তাদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। শেখ ব্রাদার্স কোম্পানী কৃষি মন্ত্রনালয় থেকে সার আমদানীকারক হিসেবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকী মূল্যে সার আমদানী করলেও তা সম্পূর্ন রূপে গ্রহণ না করে সেই চালানের কাগজ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে শেখ ব্রাদার্স।
জানা গেছে, ৫নং সার ঘাটটি ‘বিআইডব্লিউটিএ’ থেকে লিজ নিয়েছে শিবলী মাহমুদ। নিয়মানুসারে সার ঘাটেই তা আনলোড করতে হবে। আনলোড হওয়া সার অন্তত দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিলারদের মাঝে কিংবা বাজারে সরবরাহ করতে হবে বলেও নির্দেশনা রয়েছে।


তথ্যনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকশত টন সার আমদানী করে শেখ ব্রাদার্স। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ৫নং সার ঘাটে আমদানীকৃত ওই সার আনলোড করার কথা থাকলেও শেখ ব্রাদার্স তা নারায়ণগঞ্জের বরফকল ঘাটে আনলোড করে।


অথচ, প্রায় ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই বরফকল ঘাটের ইজারা বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে খোদ বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা। সরেজমিনে বরফকল ঘাটটি পরিদর্শন করেও দেখা গেছে সেখানে সাইনবোর্ড লাগিয়ে সকল ধরনের কার্যক্রম বন্ধ ও প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে।


যেখানে ২ বছর আগেই বরফকল ঘাটটি বন্ধ ও পরিত্যাক্ত করেছে বিআইডব্লিউটিএ, সেখানে এক বছর আগে কিভাবে এই বিপুল পরিমান সার আনলোড করেছে শেখ ব্রাদার্স? এমন প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র।


এমনকি আনলোড তো বটেই, পরিত্যক্ত ওই ঘাটের জায়গায় দীর্ঘ প্রায় এক বছর আনলোডকৃত সার মজুদও করে রেখেছে শেখ ব্রাদার্স। ভর্তুকী মূল্যের এই সার মজুদ করে বাজারে কৃত্তিম সংকট তৈরীর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার প্রমান মিলেছে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।


অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শেখ ব্রাদার্স এর ম্যানেজার বিশ্বজিৎ সাহা ওরফে বিশু বাবু ওই আমদানী কৃত ভর্তুকী মূলের সারের চালানের কাগজ বিক্রি করে দেয় মোবারক হোসেন বাচ্চু নামে এক সারের ডিলারের কাছে। মোবারক হোসেন বাচ্চু সরকারের সেই ভর্তুকী মূল্যের সার তুলনামূলক স্বল্প মূল্যে ক্রয় করে তা নিজের কাছে মজুদ করার পাশাপাশি বাজারে অধিক মুনাফায় বিক্রি করছে।


এই বিষয়ে জানতে চাইলে মোবারক হোসেন বাচ্চু নিজেকে শেখ ব্রাদার্স এর ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচয় দেন। তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘আমদানীকৃত সেই সার বরফকল ঘাটে ৯ মাস রাখা হয়েছিলো। ২০২৫ সালের ৩১ শে মার্চ সারগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।’


পরিত্যাক্ত ও ইজারা নিষিদ্ধ সেই স্থানে কিভাবে মজুদ করে রাখা হলো বিপুল পরিমান এই সার? এমন প্রশ্নের জবাবে মোবারক হোসেন বাচ্চু জানান, ‘৫নং ঘাটের ইজারাদার শিবলী মাহমুদের মধ্যস্থতায় বরফকল ঘাটে ৯মাস সরকারের সেই ভর্তুকী মূল্যের সার মজুদ করে রাখা হয়েছিলো।’


এদিকে, ৫নং ঘাটের ইজারাদার হলেও পরিত্যাক্ত বরফকল ঘাটের জায়গায় কোন পক্রিয়ায় সার রাখার ব্যবস্থা করেদিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ৫নং ঘাটের ইজারাদার শিবলী মাহমুদ বলেন, ‘আসলে বিআইডব্লিউটিএর কাছ থেকে বরফকলের ওই জায়গাটি প্রথমে ৩ মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছিলাম। সেখানে সার রাখা হয়েছিলো। পরবর্তীতে আরও তিন মাস এবং শেষে আরও তিন মাস বাড়িয়ে মোট ৯ মাস সেখানে সার মজুদ করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।’


পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা এবং ইজারা নিষিদ্ধ এই বরফকল ঘাটের জায়গা কোন উপায়ে ৯ মাস ভাড়া দিলো বিআইডব্লিউটিএ? কোন কর্মকর্তাই বা এই ভাড়ার পক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি শিবলী মাহমুদ।
এই বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর কার্যালয়ে গেলেও কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে তৈরী হয়েছে রহস্যের ধুম্রজাল। উঠেছে নানা প্রশ্ন।


কৃষকরা বলছেন, আমদানী কারক, ডিলার ও অসাধু ঘাট ইজারাদার সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারসাজিতেই সারা দেশে সারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ও সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ডিলারদের কাছে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে সার না পেয়ে খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তারপরও বাড়তি দামে প্রয়োজন মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমন সহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >