নারায়ণগঞ্জ । শনিবার
১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তবে কি রাজাকারদের পক্ষে টিপু
বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস বিকৃতি, ঘাতকদের পক্ষে সাফাই

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে কুঠারাঘাত করলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইতিহাস বিকৃতি, ঘাতকদের পক্ষে সাফাই দেওয়া এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস অস্বীকারে নগ্ন দালালির অভিযোগে টিপুর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সংঘটিত দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যার একটি অধ্যায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড। ১৪ ডিসেম্বরের শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে আল-বদর ও আল-শামসের ভূমিকা অস্বীকার করে তিনি কার্যত রাজাকারদের দায়মুক্তির সাফাই গাইলেন, এমন অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়েছে।

একাত্তরের বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ

রোববার (১৪ ডিসেম্বর) নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে টিপু বলেন, ১৪ ডিসেম্বর কোনো আল-বদর, আল-শামস আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে নাই। পার্শ্ববর্তী কোনো এক দেশের লোকেরা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধকে টার্গেট করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

মৃতদেহ

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু ইতিহাস বিকৃতি করেননি, বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, বিচারিকভাবে প্রমাণিত গণহত্যাকে অস্বীকার করে শহীদদের রক্তের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এমনটাই বলছেন মুক্তিযুদ্ধপন্থী রাজনীতিক ও বিশ্লেষকরা।তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সভাকক্ষ ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি নিছক ব্যক্তিগত মত, নাকি পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস মুছে ফেলার প্রচেষ্টা?

বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজন

যে হত্যাকাণ্ডের দায়ে আল-বদর নেতাদের ফাঁসি হয়েছে, যে অপরাধ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত সেই ইতিহাসকে ‘ভুল’ আখ্যা দিয়ে টিপু উল্টো জামায়াতে ইসলামীকে প্রশ্ন করেন , আপনারা কেন ইতিহাস সংশোধনের দাবি জানান না? কেন আপনাদের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী বানানো হয়েছে? এই বক্তব্যকে অনেকে দেখছেন ঘাতকদের পক্ষে প্রকাশ্য সাফাই ও পুনর্বাসনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে। টিপুর বক্তব্যের সময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের মহানগর আমীর মাওলানা আবদুল জব্বার। তিনি টিপুর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ‘আগামী সরকারের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনার দাবি’ জানান, যা সভার পরিবেশকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে আয়োজিত সরকারি সভায় কিভাবে এমন বক্তব্য নির্বিঘ্নে দেওয়া হলো? তখনও মঞ্চে উপস্থিত বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।

সভায় সরাসরি কেউ প্রতিবাদ না করলেও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড়। এনসিপি নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন জানান, প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে অস্বীকার করা যায় না। টিপু ভাইয়ের মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন বক্তব্য আসবে, তা কল্পনাও করিনি। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ওই সভায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে এমন চিন্তা করে আমরা সরাসরি প্রতিবাদ জানাইনি, তবে কোনোভাবেই এই বক্তব্যকে সমর্থন করা যায় না। সভা শেষে টিপু ভাইকেও আমরা এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের কথা বলেছি।

গণসংহতি আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম সুজন বলেন, বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে পাক-হানাদার বাহিনী আল-বদর ও আল-শামসকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। যারা এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে, তারা হয় ইতিহাস জানে না, নয়তো সচেতনভাবে দেশবিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।

তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে চাপের মুখে পড়ে টিপু দাবি করেন, এটি তার ব্যক্তিগত মত, দলীয় অবস্থান নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের সরকারি মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত মতের নামে কি মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা যায়?

টিপুর এই বক্তব্যের সঙ্গে দলীয়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি জানান, আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং দলীয়ভাবেও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। বিষয়টি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নজরে আনা হয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত ‘ব্রেইন কিলিং অপারেশন’, যার বাস্তবায়নে আল-বদর ও আল-শামস ছিল প্রধান হাতিয়ার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদর এবং আল-শামসের এ সত্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, আদালতের রায়ে প্রমাণিত এবং শহীদ পরিবারের রক্তসাক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির ভয়ংকর নজির বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইতিহাস অস্বীকার করে আজ যারা নতুন ‘তৃতীয় পক্ষ’ আবিষ্কার করছেন, তারা কি সত্যিই ইতিহাস জানেন না, নাকি রাজনৈতিক প্রয়োজনে রাজাকারদের পুনর্বাসনের বিপজ্জনক খেলায় মেতেছেন? শহীদদের রক্ত কি এতটাই সস্তা যে, দিবসের মঞ্চে দাঁড়িয়েই তাদের হত্যাকারীদের রক্তাক্ত হাত ধুয়ে দেওয়া যায়?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >