জালিমের বুলেটবিদ্ধ শিশু রিয়া গোপের কথা মনে পড়ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে শিশু রিয়াসহ সকল শহীদ ও আহত সহযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। মুক্তিকামী মানুষকে শুভেচ্ছা।
দুই বছর আগে ঠিক এই সময়টাতেই সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জ তার শক্তি, সাহস ও ঐক্যের এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। দীর্ঘদিনের গডফাদারতন্ত্র, সন্ত্রাস, গুম, খুন, দখলদারিত্ব ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে প্রমাণ করেছিল, সংগঠিত জনগণের শক্তির সামনে কোনো দখলদার শক্তিই টিকতে পারে না। অপমানের বিরুদ্ধে মর্যাদা, ভয়ের বিরুদ্ধে সাহস এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাই সেদিন নারায়ণগঞ্জকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সেই ঐক্যের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছিল অত্যাচারীদের সাম্রাজ্য। দেশ ছেড়ে, শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল সন্ত্রাসীরা।
মানুষের ঐক্যবদ্ধতার সেই বিজয়ের দুই বছর পার হলো। এর ফল হিসেবে মানুষ পুনরায় তাদের ভোটাধিকারের মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, ৫৪ জন শহীদের জীবনের বিনিময়ে যে নারায়ণগঞ্জ আমরা চেয়েছিলাম তা এখনো দিগন্তের ওপারে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ আজও প্রতিনিয়ত নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের জন্য লড়ছে।
শহীদদের রক্তে ভেজা এই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবারও সেই পুরোনো অসহিষ্ণুতা, ঔদ্ধত্য ও সহিংসতা ফিরে আসার পথ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে মেধার বদলে পেশিশক্তির মহড়া শুরু হয়েছে।
মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির আখড়াগুলো আঘাতের শিকার হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হামলা, মামলা-বাণিজ্য ও ক্ষমতার দম্ভের কাছে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনসহ সরকারি দপ্তরগুলো সেই পুরোনো নিয়মেই ক্ষমতার গোলামি করছে।
শাসকের মুখ বদলালেও যদি শাসনের ভাষা, সংস্কৃতি ও আচরণ না বদলায়, তবে ফ্যাসিবাদ বিলোপ হয় না। এখানেই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য ম্লান হয়ে পড়ে। জনগণ তার শক্তির উপলব্ধি হারায়। তখন মানুষ দেশ গড়ার স্বপ্নের বদলে দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখে। জুলাইয়ে দেশের প্রয়োজনে সন্তানদের রাজপথে পাঠানো অভিভাবকেরাও হতাশ হয়ে পড়েন।
একসময় মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বঘোষিত চ্যাম্পিয়নদের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আজ কখনও কখনও একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটে ‘২৪-এর চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার দাবিদারদের মধ্যেও। অথচ জুলাইয়ের লড়াই কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন ছিল না। এটি ছিল সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের মালিকানা কেবল জনগণের। আমরা রাজনৈতিক কর্মীরা সেই মুক্তিকামী মানুষের সহযাত্রী হয়েছিলাম মাত্র।
আমরা আজও এমন একটি দেশ, এমন একটি নারায়ণগঞ্জের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষের জীবন হবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে রাষ্ট্রের প্রধান এজেন্ডা। যেখানে প্রতিহিংসা, পেশিশক্তি আর দখলদারিত্বের বদলে রাজনীতি পরিচালিত হবে যুক্তি, বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে।
আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই যেখানে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, চেতনাবাজি কিংবা মামলাবাজি রাজনীতির সমার্থক হবে না। ক্ষমতার দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা থাকবে না। যেখানে বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয়, আর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ভাষা কখনোই রক্তপাত, ‘চামড়া খুলে নেওয়া’ কিংবা ‘জবাই করে ফেলার’ হুমকি হবে না।
অনেকে হয়তো বলবেন, এমন স্বপ্ন অবাস্তব। কিন্তু মাত্র দুই বছর আগেই তো আমরা এই স্বপ্ন নিয়েই একে অপরের হাত ধরেছিলাম, রাজপথে নেমেছিলাম। সেই ঐক্যের শক্তিতেই আমরা বিজয়ের স্বাদ পেয়েছিলাম।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ঐক্যবদ্ধ লড়াই কখনো পরাজিত হয় না। মহান মুক্তিযুদ্ধের যে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সেই যাত্রাকেই নতুন গতি দিয়েছে। এখন সেই যাত্রাকে পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য, সুস্পষ্ট রূপরেখা, রাজনৈতিক সততা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং নিরবচ্ছিন্ন গণসংগ্রাম।
আমরা যেন ভুলে না যাই, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ কেবল রাষ্ট্রকে বিকল করেনি, মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেও বিকৃত করেছে। যদি আমরা ফ্যাসিবাদের বিলোপ চাই, তবে আমাদের চিন্তা, ভাষা ও আচরণে মিশে যাওয়া ফ্যাসিবাদকে চিহ্নিত করতে হবে। সেই সংস্কৃতি থেকে বের হতে সচেষ্ট হতে হবে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণে এখনো যথেষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও আমরা একই কথা বলছি- শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত বিজয় নিশ্চিত করতে পারে।
ভয়, সন্ত্রাস ও দখলের বিপরীতে একটি নিরাপদ, সন্ত্রাসমুক্ত ও বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই মানুষ গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। আসুন, আমাদের বীরদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেই স্বপ্নের নারায়ণগঞ্জ গড়তে ঐক্যবদ্ধ থাকি। আমরা যেন ভুলে না যাই, ঐক্যবদ্ধ জনগণই ইতিহাসের নির্মাতা।
লেখক: ফারহানা মানিক মুনা, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন
তথ্যসূত্রঃ প্রেস নারায়ণগঞ্জ








