নারায়ণগঞ্জ । রবিবার
১৪ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যানজট কাড়ছে মুমূর্ষ রোগীর প্রাণ!

বিশেষ প্রতিবেদক : এই তো ক’দিন আগের কথা| সন্ধ্যার আলো-আঁধারের দোলাচলে ব্যস্ত এই নগরী তখন কোলাহলে পূর্ণ| সাপ্তাহিক ছুটি হলেও শহুরে সড়কের দৃশ্য দেখে বুঝার উপায় ছিলো না দিনটি ছিলো শুক্রবার| শহরের প্রাণকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাড়া থেকে ২নং রেলগেইট পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে যানবাহনের দীর্ঘসারি; পর্যায়ক্রমে যা রূপ নিয়েছিল ‘মহা যানজটে’! তীব্র এই যানজটের মাঝেই চাষাড়া বালুর মাঠের ভাষা ˆসনিক সড়কে আটকে পড়েছিল মুমূর্ষ রোগীবাহি এক এ্যা¤^ুলেন্স| ইমাজেন্সি সাইরেনের প্রতিটি শব্দ তরঙ্গ যেন ভেসে আসছিলো ভেতরে থাকা রোগীর ¯^জনদের চাপা আকুতি ও আহাজারী হয়ে| তবে সেই আওয়াজ কী আদৌ পৌছেছে দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের কানে? সেই প্রশ্নটাও যে বেশ পুরোনো|


নগরবাসী বলছে, রোগীবাহি এ¤^ুলেন্স আটকে থাকার মত এমন নিষ্ঠুর যানজটের ঘটনা যেন নিত্যদিনের| ছোট্ট এই শহুরে সড়কে নেই কোনো ইমার্জেন্সি লেন| অবশ্য প্রধান সড়কের লেনের প্রশস্ত-ই যেখানে পর্যাপ্ত নয়, সেখানে ইমার্জেন্সি লেনের কথা বলাটাও হয়তো বিলাসিতার সামিল কিংবা অমূলক| তবে সময় যখন পরিবর্তনশীল, তখন সময়ের প্রয়োজনেই এমন যৌক্তিক ‘বিলাসিতার’ মৌলিক আধিকারের আওয়াজ তোলাটা যেন সময়েরই দাবি হয়ে উঠেছে- এমনটাই বলছেন সচেতন মহল|


এদিকে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কেবল চাষাড়া থেকে ২নং রেল গেইট পর্যন্তই নয় বরং যানজটের ভোগান্তি অসহনীয় হয়ে উঠে এই শহরের গুরুত্বপূর্ন প্রতিটি সড়ক| এই যানজটের কবল থেকে রেহাই মেলেনা অ্যা¤^ুলেন্সবাহী মুমূর্ষু রোগীদের| মুহুর্মুহু সাইরেন বাজিয়ে চারপাশ ‘তপ্ত’ করে তুললেও তা যেন ‘গলাতে’ পারেনি অবরুদ্ধ হয়ে উঠা যানজটের এই নগরীকে|
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বালুর মাঠের ভাষা ˆসনিক সড়কের এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত অচল প্রায়|

এসময় বালুর মাঠে অবস্থিত ইসলাম হার্ট সেন্টার থেকে ফেরৎ পাঠানো ষাটোর্ধ এক মুমূর্ষ রোগীকে অ্যা¤^ুলেন্স যোগে ঢাকার হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার ¯^জনরা| ভাষা ˆসনিক সড়কের শহীদ মিনারের সামনে তীব্র যানজটে তখন অবরুদ্ধ হয়ে পরেছিল সেই অ্যা¤^ুলেন্সটি| লাগাতার ইমার্জেন্সি হর্ণ বাজিয়ে গেলেও অসহায়ের ন্যায় এক তা জায়গাতেই আটকে ছিলো|

ভিতরে থাকা রোগীর ¯^জনরা তখন দিশেহারা| কেউ কান্না ভেঙে পরছেন; কেউ আবার রাস্তায় নেমে যানজট মারিয়ে অ্যা¤^ুলেন্স এগিয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন| এভাবে প্রায় ২০ মিনিটেরও বেশি সময় প্রচেষ্টার পর শহীদ মিনার চত্বর অতিক্রম করলেও চাষাড়ার রাইফেল ক্লাব ও আর্মি মার্কেট এলাকায় অবস্থিত অবৈধ স্ট্যান্ডের সামনেও ঘটে একই ঘটনার পূনরাবৃত্তি! আরও প্রায় ১০ মিনিট জ্যামে আটকে থাকার পর মুমূর্ষু রোগী নিয়ে ঢাকার পথে ছুটে চলে অ্যা¤^ুলেন্সটি|


আশংকাজনক অবস্থায় থাকা ওই রোগীর ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী জুটেছে তা জানা না গেলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তীব্র যানজটে ধুঁকতে থাকা এই নগরীতে এমন করুণ দৃশ্যের দেখা মিলে প্রতিনিয়তই| ঢাকার হাসপাতালে যাওয়ার পথে রোগী মারা যাওয়ার মত নির্মম ঘটনাও নেহাত কম নয়! তথ্য বলছে, নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যায় রূপ নেয়া এই অসহনীয় যানজটের বিষয়টি জেলার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল মহলেও উত্থাপিত হয়ে আসছে বারংবার| সুনির্দিষ্ট কারণগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে বহু আগেই| বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরাও তা সমাধানের আশ্বাস ও করণীয় বিষয়ে আওয়াজ তুলেছেন বহুবার| ক্ষনিকের জন্য তা আশা জাগালেও সমাধান না মেলায় হতাশায় নিমজ্জিত হতে হয়েছে নগরবাসীকে|


এদিকে, যানজটের কারণ নিয়ে কেউ বলছেন, শহরের বুক চিরে সড়কের উপরে বিদ্যমান রেলওয়েতে ঘন ঘন ট্রেন চলাচল ও একাধিক ব্যারিয়ার উঠা নামার কারণে বাধছে যানজট| আবার কেউ কেউ এই একটি মাত্র কারণকে দায়ি করতে নারাজ| কারো মতে, শহরের ভিতরে বাস টার্মিনাল ও বাস (গণপরিবহন) সমূহের অবাধ চলাচলের কারণে তীব্র হচ্ছে যানজট|


আবার অনেকে বলছেন, শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে গড়ে উঠা বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মার্কেট, অফিস কিংবা বা অন্যান্য স্থাপনাগুলোতে বাধ্যতামূলক হলেও পার্কিং স্পেসের আইন তোয়াক্কা না কারায় ফুটপাত ও মূল সড়কে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে বাধছে যানজট|


এছাড়াও ফুটপাত পূনরায় দখল, মোড়ে মোড়ে অবৈধ স্ট্যান্ড, শহুরে সড়কে ব্যাটারী চালিত রিকশা ও ইজিবাইকের অবাধ চলাচল ও ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে নগরবাসী, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক কমিটি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গদের কাছ থেকে|


ফলে নগরীতে যানজট লেগে থাকার কোনো কারণই আর অজানা নয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বা দায়িত্বশীল সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের কাছে| তবে চিহ্নিত হয়ে উঠা এসকল সমস্যাগুলো সমাধানে ঠিক কবে নাগাদ সফল হবেন দায়িত্বশীলরা, সেই প্রশ্ন আপাততঃ দীর্ঘই হচ্ছে|


তারা বলছেন, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, পুলিশ প্রশাসন ও বিআরটিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাঝে সমšি^ত উদ্যোগ বা সম্মিলিত সদিচ্ছার অভাব না থাকলে নারায়ণগঞ্জকে যানজট মুক্ত করা যেত আরো আগেই|


এই বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘আমাদের শহরের সড়কগুলো প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত প্রশস্ত নয়| খুবই সংকীর্ণ| এছাড়াও আরো নানা কারণে যানজট হচ্ছে| সমস্যাগুলো চিহ্নিত| আমি দায়িত্ব পাওয়ার পরই এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিয়েছি| শহরের চিত্রটাও বদলে গিয়েছিল|

কিন্তু নানা বিশৃঙ্খলার দরুণ স্থায়ী সমাধান মিলছে না| এই বিশৃঙ্খলা মানুষই সৃষ্টি করছে| আইন বা নির্দেশনা মানা হচ্ছে না| যেখানে সেখানে পার্কিং করা হচ্ছে| উল্টো পথে গাড়ি চলাচল করছে| ট্রাফিক আইন মানা হচ্ছে না| আমরা সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিনিয়তই এসকল সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাচ্ছি| অভিযান হচ্ছে| আসলে আমি মনে করি, সকলেই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে আগে সচেতন ও দায়িত্বশীল হয়, তাহলে এই সমস্যা দূর হবে|’


আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা নূরউদ্দিন বলেন, ‘শহরে আমরা দূর্বিসহ যানজটের মধ্যে আছি| নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে| ইতিপূর্বে নাগরিক কমিটিসহ আমাদের সংগঠন থেকেও যানজট নিরসন সহ নগরীর সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করেছি| এখন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আন্তরিক না হয়, তাহলেতো সমস্যার সমাধান হবে না| নারায়ণগঞ্জ ও মানুষের ¯^ার্থে কর্মকর্তাদের উচিত আন্তরিকতার সাথে সম্মিলিত ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া|’


সু—শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘যানজট নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বহু কথা বলে আসছি| প্রথমত এখানে হকার একটি বড় ইস্যু| রাস্তাটা হকারদের দখলে থাকে| হকারমুক্ত করার পর অনেকটাই শহরের চিত্র অনেকটাই বদলে গিয়েছিল| কিন্তু তা ধরে রাখা যায়নি| এছাড়াও অবৈধ কিছু গাড়ী নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করে, এটাও যানজটের অন্যতম একটি কারণ| তাই আমরা মনে করছি যে, যানজট নিরসন করতে গেলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ এবং স্থানীয় জনগণের সমšি^ত উদ্যোগ ছাড়া এটা নিরসন করা সম্ভব না| এরজন্য শুধু উদ্যোগ নিলেই চলবে না, এখানে আন্তরিকতার সাথে সকলের দায়িত্ব পালন করতে হবে|’

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >