নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার শিল্পাঞ্চলখ্যাত তারাবো পৌরসভায় প্রায় ১০ দিন ধরে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো বাসিন্দা। পৌর এলাকার আবাসিক অঞ্চল, হাট-বাজার, সড়কের পাশ এবং বিভিন্ন সেকেন্ডারি বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্রে ময়লা-আবর্জনা জমে ছোট ছোট ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত সেবা বাবদ অর্থ পরিশোধ করলেও তারা কাঙ্ক্ষিত পরিচ্ছন্নতা সেবা পাচ্ছেন না। দুর্গন্ধের কারণে বাসাবাড়িতে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা যেমন কঠিন হয়ে উঠেছে, তেমনি সড়কে চলাচলও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডজুড়ে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
জানা গেছে, লাখো মানুষের বসবাসের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের কারণে তারাবো পৌরসভায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত ব্যবস্থাপনায় এসব বর্জ্য অপসারণ করা হলেও সম্প্রতি ঠিকাদার পরিবর্তনের পর কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়।
পৌর এলাকার বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও বাজারের বর্জ্য নির্ধারিত সেকেন্ডারি সংগ্রহকেন্দ্রে ফেলা হয়। সেখান থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ভ্যানগাড়ির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য সরিয়ে নিতেন। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ডিউটি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পৌরসভার টেন্ডারের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি বাসাবাড়ি থেকে মাসিক ৬০ টাকা হারে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ সেবা দিয়ে আসছিলেন।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পায় মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনের প্রতিষ্ঠান অহনা ট্রেডার্স। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পরও এখনো মাঠপর্যায়ে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন সেকেন্ডারি পয়েন্ট, বাসাবাড়ি ও সড়কের পাশে বর্জ্যের স্তূপ জমে যায়।
বর্তমানে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের মৌসুম চলায় বর্জ্যের পরিমাণও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব পচনশীল বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পৌরসভার এলাকার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, সেকেন্ডারি পয়েন্টগুলোতে ময়লা জমতে জমতে ছোটখাটো ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অথচ ১০ দিন ধরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমাদের চোখে পড়ছে না।
আরেক বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার বলেন, আমরা টাকা দিয়েও সেই মানের সেবা পাচ্ছি না। প্রায় এক সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল ময়লা অপসারণ হচ্ছে না। বাসার পাশে ময়লার স্তূপের কারণে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে
এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, ময়লার দুর্গন্ধের কারণে আমাদের চলাচলের সমস্যা হচ্ছে। নাক চেপে ধরে আমরা কলেজে যাই। শিগগিরই এই ময়লা অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গন্ধের কারণে শিশু, শিক্ষার্থী ও বয়ষ্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। বাজার এলাকায় ক্রেতাদের উপস্থিতিও কমে গেছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য জমে থাকায় পথচারী ও যাত্রীদেরও দুর্ভোগ বাড়ছে।
অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার মো. আলতাফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত ৮ জুন টেন্ডারের মাধ্যমে আমাদের প্রতিষ্ঠান বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব পেয়েছে। প্রয়োজনীয় ভ্যানগাড়ি সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগায় কার্যক্রম শুরুতেই বিলম্ব হয়েছে। তবে গত দুই দিন ধরে নিয়মিতভাবে বর্জ্য অপসারণ শুরু হয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই দিনের মধ্যে আমাদের পৌরসভার সব এলাকায় জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হবে। সেবার মান উন্নয়নে নতুন কয়েকটি ভ্যানগাড়িও যুক্ত করা হচ্ছে।
এদিকে সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিউটি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ৭ জুন পর্যন্ত আমরা তারাবো পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। ৮ জুন থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেলেও তারা এখনো কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু করতে পারেনি। জনস্বার্থের চিন্তা করে আমাদের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কার্যক্রম চালুর জন্য পৌর প্রশাসক ও ইউএনওর কাছে আবেদন করেছি। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। ফলে বর্জ্য অপসারণ বন্ধ থাকায় জনভোগান্তি বাড়ছে।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও তারাবো পৌরসভার প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং নতুন ঠিকাদারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। বর্জ্য অপসারণের জন্য বিশেষ ধরনের ভ্যান সংগ্রহ করতে কিছুটা সময় লেগেছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে তারা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু না হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা হবে।







