ঈদের আনন্দ কাটতে না কাটতেই বাড়তি খরচের ধাক্কা আসছে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি শিগগির বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেবে। এটা ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এবার লাইফ লাইন বা গরিবের জন্য বিদ্যুৎ বিলের স্তরে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
আগের মতোই রাখা হচ্ছে। বিইআরসির এক কর্মকর্তা জানান, ঈদের বন্ধের আগেই সব গোছানো হয়ে গেছে। শিগগিরই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হবে। কারণ জুন থেকেই বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর করতে হবে।
জানা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। দাম নির্ধারণে দুই মাস আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই কমিটি বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ১ টাকা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী বিইআরসির মাধ্যমে যেন বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে ২০ ও ২১ এপ্রিল ২ দিন গণশুনানি করে বিইআরসি। শুনানিতে দেশের ৬টি বিতরণ কোম্পানি বিদ্যুতের খুচরা মূল্য প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে। শুনানিতে গ্রাহকদের প্রতিনিধিরা জানান, বিদ্যুৎ খাতে প্রচুর অনিয়ম-দুর্নীতি আছে।
সেগুলো বন্ধ না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিম্ন এবং মধ্যবিত্তের পকেট কাটার ফন্দি। এ মুহূর্তে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। তাই কোনো ভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না। শুনানিতে স্টিল মিলের মালিকরা বলেন, ‘কোভিডের পর দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ খারাপ। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশের স্টিল মিলগুলো একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।’
গণশুনানিতে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ‘কোনোভাবেই গরিব গ্রাহকের (লাইফ লাইন) ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।’
দেশে এখন বিদ্যুতের গ্রাহক ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৪৮১ জন। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ১২১। এর মধ্যে গরিব (লাইফ লাইন) অর্থাৎ শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন এমন গ্রাহক ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০ জন।
বিইআরসির কর্মকর্তারা জানান, কমিশন কোনোভাবেই এখন লাইফ লাইনে হাত দেবে না। কারণ গত কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী। দেশে গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় লাইফ লাইন গ্রাহকদের ঘাড়ে বাড়তি বিল চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
বিইআরসির কাছে দেওয়া প্রস্তাবে পিডিবি তার খুচরা গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট ৮৫ পয়সা, আরইবি ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ডিপিডিসি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ডেসকো ১ টাকা ৯৮ পয়সা, ওজোপাডিকো ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নেসকো ২ টাকা ৫ পয়সা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তবে বিইআরসির কারিগরি দল সুপারিশ করেছে বিতরণ কোম্পানির বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে।
জানা যায়, বিইআরসি তার কারিগরি কমিটির সুপারিশকৃত এক টাকা ২৫ পয়সার প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারে। সংস্থাটির একজন কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ‘গণশুনানি ও অন্যান্য জায়গা থেকে সব মতামত পাওয়া গেছে। এখন বিইআরসি সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কত বাড়বে। তবে এই বাড়তি বিল ইউনিট প্রতি ১ টাকার কম নয়।
তিনি বলেন, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত কম দাম বাড়ানো হবে বিদ্যুতের। এরপর ২০০ থেকে ৪০০ এবং ৪০০ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে। তবে বেশি দাম বাড়ানো হবে ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বের গ্রাহকদের। সব মিলিয়ে পিডিবির যাতে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো আয় বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিডিবি জানায়, ২০২৬-২৭ সালে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রির কারণে পিডিবির লোকসান হবে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেবে সরকারি এই সংস্থা। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে পিডিবি। এরপরও বড় অঙ্কের টাকা ঘাটতি থেকে যাবে তাদের।







