তেইশ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলাম ক্রিকেটার হিসেবে। তখন এক ধরনের পরিবেশ ছিল। তখন আমাদের একভাবে দেখা হয়েছিল। আর এবার এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম কিছু পেলাম। দেখলাম, বাংলাদেশকে মানুষ সম্মান করছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও অন্য চোখে দেখছে। এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।’
কথাগুলো বলছিলেন হাবিবুল বাশার সুমন। একই মানুষ। প্রতিপক্ষ একই অস্ট্রেলিয়া। দুই ম্যাচের মধ্যে একটি ভেন্যুও সেই এক। মাঝখানে শুধু কেটে গেছে ২৩টি বছর।
২০০৩ সালে যে অস্ট্রেলিয়ায় খেলোয়াড় হিসেবে এসে হারের ভার, সঙ্গে ঠাট্টা, কৌতুক এবং বাংলাদেশকে বিভিন্নজনের করা হালকা চালের কথাবার্তা গলাধঃকরণ করে ফিরেছিলেন বাশার, ২৩ বছর পর সেই অস্ট্রেলিয়াতেই ফিরলেন প্রধান নির্বাচক হয়ে। এবার তার চোখের সামনে বাংলাদেশ জিতেছে। শুধু ম্যাচ নয়, জিতেছে সম্মানও। একসময় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ঠাট্টা হতো, বলা হতো, একদিনে টেস্ট ম্যাচ শেষ করা যায় কি না! সেই বাংলাদেশকেই অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান এবং সাবেক ক্রিকেটাররা অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ডারউইনের জয় এবং ম্যাকাইয়ে বড় হারের গল্পটা তাই শুধু একটি ক্রিকেটীয় সিরিজের নয়। গল্পটা বদলে যাওয়ার। গল্পটা বদলে দেওয়ার।
২৩ বছর আগের ক্ষত
২০০৩ সাল। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম সফর। দুই টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হার। দুটি ম্যাচই আড়াই দিনের মধ্যে শেষ। মাঠে পুরোপুরি শক্তিহীন শ্রীহীন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। মাঠে প্রতিপক্ষের দাপট, বাইরে সমালোচনা আর নিষ্ঠুর ঠাট্টা। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ তখন প্রায় নতুন। চারধারের সবকিছুই অচেনা।
সেই সফরের বাংলাদেশ আর এবারের বাংলাদেশকে পাশাপাশি রাখলে যেন দুটি আলাদা ছবি।
সেদিন বাশার ছিলেন দলের ব্যাটসম্যান। এবার তিনি নির্বাচক। সেদিন দেখেছিলেন বাংলাদেশের অসহায়ত্ব। এবার দেখলেন বাংলাদেশের লড়াই, জয়। ম্যাচ শাসন করার ক্ষমতা। সেবার অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছিল বাংলাদেশ মাথা নিচু করে। এবার ফিরল মাথা উঁচু করে। সিরিজের সমান-সম্মান নিয়ে।
ডারউইনের সেই সকাল
অথচ শুরুটা মোটেও এমন ছিল না। প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামার আগে সেই ইনিংস দেখে অনেকেরই মনে হয়েছিল, পুরোনো গল্প বুঝি আবার ফিরে আসছে।
তারপর ডারউইন। সেখানেই গল্পের মোড় ঘুরে গেল।
৯ উইকেটের বিশাল জয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারাল বাংলাদেশ। মাত্র ১১ সেশনে শেষ হলো টেস্ট। হাসান মাহমুদ নিলেন ৯ উইকেট। তানজিদ হাসান খেললেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরির ইনিংস। শান্তর ব্যাটে ৮৪ রান। সঙ্গে বুদ্ধিদ্বীপ্ত অধিনায়কত্ব। দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে সাফ করে দিল।
প্রস্তুতি ম্যাচে যে দল ৫৪ রানে ভেঙে পড়েছিল, সেই দলই কয়েক দিন পর অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলকে ভেঙে দিল। বাংলাদেশ যেন নিজের কাছেই প্রমাণ করল, প্রস্তুতি ম্যাচের স্কোরকার্ড দিয়ে কোনো দলের আসল পরিচয় লেখা যায় না।
সংখ্যাটা ছোট করার সুযোগ নেই
ডারউইনের জয়কে নিছক একটি অঘটন বলেও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। গত ১৫ বছরে ভারত অস্ট্রেলিয়ায় ২১টি টেস্ট খেলে জিতেছে পাঁচটিতে। ইংল্যান্ড ২০ টেস্টে জিতেছে একটিতে। নিউজিল্যান্ড আট ম্যাচে জয় পেয়েছে একটিতে। শ্রীলঙ্কা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের মুখ দেখেনি।
সেই তালিকার পাশে বাংলাদেশের ডারউইন জয়কে রাখলে এর মাহাত্ম্যটা বোঝা যায়। এটি ভাগ্যের জয় নয়। পরিকল্পনার জয়। পেসারদের আগ্রাসন, ব্যাটসম্যানদের সাহস এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজেদের স্নায়ু ধরে রাখার জয়।
পেস বোলিং বিপ্লব
এই সফরের সবচেয়ে বড় গল্প সম্ভবত বাংলাদেশের পেস বোলিং। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বোলিং মানেই ছিল স্পিন। বিদেশের মাটিতে পেসারদের নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে বাংলাদেশের পেস ইউনিটই। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার শন টেইটও বলেছেন, বাংলাদেশের শক্তির জায়গা এখন পেস বোলিং।
বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিততে হলে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে হয়। বাংলাদেশ এবার সেটাই করেছে। শুধু ডারউইনে নয়, পুরো সিরিজেই বাংলাদেশের পেসাররা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের ওপর চাপ তৈরি করেছেন।
এটা শুধু একটি সিরিজের সাফল্য নয়। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও এটি বড় একটি বার্তা।
বাশারের চোখে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
এই জায়গাতেই হাবিবুল বাশারের গল্পটা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তিনি দুই বাংলাদেশকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশের অসহায়ত্ব দেখেছিলেন। বাংলাদেশের আক্রমণাত্মক মেজাজও দেখলেন।
ডারউইনের জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের আচরণ, স্থানীয় মানুষের অভিনন্দন, সাবেক কিংবদন্তিদের সঙ্গে দেখা, সবকিছুতেই তিনি পরিবর্তনটা অনুভব করেছেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো কিংবদন্তির সঙ্গে দেখা হয়েছে তার। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের কথাবার্তাতেও বাংলাদেশকে নিয়ে এসেছে নতুন সম্মানের সুর। বাশারের কাছে সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটি জয় স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে। ক্রিকেটের পরিসংখ্যানে সেই অর্জনটা থাকে। কিন্তু একটি দলের বদলে যাওয়া লেখা থাকে মানুষের চোখে, হৃদয়ে, মননে। ক্রিকেট দলের এবারের অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে সেই সম্মানটাই পেয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাকাইয়ের ধাক্কা
ম্যাকাই অবশ্য আবার বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে বাংলাদেশকে। ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে সিরিজ শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়। মিচেল স্টার্কের গতি আর অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটিং আবারও নড়বড়ে হয়েছে।
তবু এই হার ডারউইনের জয়ের আনন্দকে মুছে দিতে পারে না। বরং দুই টেস্টের সিরিজ ১-১ করে শেষ করাটাই বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে প্রথমবার টেস্ট জেতা, এরপর সিরিজ ড্র করে ফেরা, এই সফর বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে গেছে।
নতুন গল্পের বাংলাদেশ
২৩ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশের ফেরার গল্পে ছিল হতাশা, অপমান আর প্রশ্ন। ২৩ বছর পর সেই একই দেশ থেকে ফেরার গল্পে আছে জয়, সম্মান আর নতুন আত্মবিশ্বাস। এটাই আসল পরিবর্তন।
ডারউইন বাংলাদেশকে দিয়েছে ইতিহাস। ম্যাকাই দিয়েছে বাস্তবতার শিক্ষা। আর পুরো সফরটি দিয়েছে তার চেয়েও বড় কিছু—নিজেদের নিয়ে নতুন করে বিশ্বাস করার সাহস।
২৩ বছর আগে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরেছিল হারের গল্প নিয়ে। ২৩ বছর পর সেই বাংলাদেশ ফিরল একটি গল্প বদলে দিয়ে।
গল্পটা তাই আর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হারার গল্প নয়। গল্পটা হলো, একদিন যাদের নিয়ে হাসাহাসি হয়েছিল, তারাই আজ সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে সম্মানের গল্প লিখেছে।
ধন্যবাদ, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।







