মাঠে বল গড়ানোর আগেই আটলান্টার গ্যালারিতে ‘সাত’ সংখ্যা যেন হেঁটে বেড়াচ্ছিল। লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেজর টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে নেমেছিলেন সাতবার, আর সাতবারই ফাইনালের টিকিট কেটেছে দলটি। সংখ্যাটা আট-এ উন্নীত করার মিশন ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
মেসি পেরেছেন দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল জেতাল, ক্যারিয়ারে তৃতীয় বার।
গল্পের শুরু ২০০৭ সাল থেকে, ভেনেজুয়েলার মাটিতে কোপা আমেরিকার সেমিফাইনাল দিয়ে। যেখানে তরুণ মেসি মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ৩-০ ব্যবধানে জয় এনে দিয়েছিলেন। সময় গড়িয়েছে, মেসি পরিণত হয়েছেন। শক্ত হয়েছে বড় ম্যাচের নার্ভও। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোলশূন্য ৯০ মিনিট আর টাইব্রেকারের রুদ্ধশ্বাস লড়াই পেরিয়ে ফাইনালে পা রাখা সেই ম্যাচেও মেসি ছিলেন স্থির, অবিচল।
সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় বোধকরি ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকা। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মেসি একাই তৈরি করেছিলেন ৩ গোলের সুযোগ ৬-১ ব্যবধানের সেই জয়ে এই তারকার পায়ের কারিকুরিতে ছিল শৈল্পিক প্রদর্শনী। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কোপা আমেরিকা শতবার্ষিকীর সেমিফাইনালেও একই গল্প এক গোল, দুই অ্যাসিস্ট, ৪-০ জয়। তারপর এলো ২০২১ সাল, মহামারির ছায়া তখনো কাটেনি বিশ্ব থেকে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ ১-১ গোলে অমীমাংসিত থেকে গড়ায় টাইব্রেকারে। মেসি নিজে গোল না পেলেও অ্যাসিস্ট করেন। দল ৩-২ ব্যবধানে জিতে পা রাখে ফাইনালে। যে ফাইনাল দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনা পায় শিরোপার স্বাদ।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মেসি যেন সময়টাকে থামিয়ে দিয়েছিলেন। এক গোল, এক অ্যাসিস্ট, আর ম্যাচসেরার পুরস্কার ৩-০ ব্যবধানের জয় ছিল আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক রাতগুলোর একটি। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় কানাডার বিপক্ষে ম্যাচ, বয়স যখন ৩৬ পেরিয়েছে। তখনো মেসির পা থেকে বেরিয়ে এলো ভাগ্য নির্ধারণী গোল, যা দলকে ফাইনালে তোলে।
সাত ম্যাচ, সাত জয়, একটিও হার নেই, দুটি ম্যাচ নির্ধারিত হয়েছে টাইব্রেকারে। ৪ গোল এবং ৭ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে গোলে সরাসরি অবদান ১১ গোলে। এই পরিসংখ্যান শুধু একজন ফুটবলারের সামর্থ্যের প্রমাণ নয়, বরং এক ধরনের মানসিক দৃঢ়তার দলিল। যেখানে চাপ যত বাড়ে, মেসির খেলা তত পরিণত হয়ে ওঠে। ফুটবল ইতিহাসে এমন ধারাবাহিকতা বিরল। বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়দের অনেকেই হোঁচট খেয়েছেন, কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে সেমিফাইনাল যেন হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, বদলায়নি শুধু ফল আর্জেন্টিনা প্রতিবারই এগিয়ে গেছে পরের ধাপে।
ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে প্রশ্ন ছিল একটাই ইতিহাসের অপরাজেয় ধারা কি অক্ষত থাকবে, নাকি নতুন কোনো অধ্যায় লেখা হবে ফুটবলের এই চিরন্তন নাটকে? নাটকের মঞ্চ তৈরি হয়েছিল অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত অদম্য, দুরন্ত মেসি ইতিহাসের ধারাই অব্যাহত রাখলেন। এ যাত্রায় গোল পাননি ঠিকই, কিন্তু অবদান রাখলেন জোড়া অ্যাসিস্ট করে। কখনো গোল করে, কখনো বা গোলের নেপথ্য কারিগর হিসেবে দুই ভূমিকায় কিছু করতে না পারলেও অনুপ্রেরণা হিসেবে সতীর্থদের পাশে থেকে।
চলমান আসরে মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলসংখ্যা সমান, আটটি করে। কিন্তু অ্যাসিস্টের দিক থেকে ফরাসি তারকাকে ছাড়িয়ে গেলেন মেসি। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট সবচেয়ে বেশি ১২ গোলে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন ইন্টার মায়ামি তারকা। মেসির আর্জেন্টিনা ফাইনালে, এমবাপ্পের ফ্রান্স খেলবে স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। দুই তারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথের মঞ্চটা এখনো উন্মুক্তই আছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে স্থান নির্ধারণী প্লে-অফ এমবাপ্পের সামনে মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। মেসিও সুযোগ পাচ্ছেন স্পেনের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে। এটি হতে যাচ্ছে মেসির তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১৪ সালে অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে স্বপ্নভঙ্গ। ২০২২ সালে কাতারে শিরোপা জয়ের পর এবার সেটা রক্ষা করার মিশন।








