২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বিতর্কিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ ওরফে মডেল মাসুদ। রাতারাতি চেম্বার অব কমার্সের ‘ভারপ্রাপ্ত’ সভাপতি পদে আসিন হন তিনি। নিয়ন্ত্রন নেন ব্যবসায়ীদের এই গুরুত্বপূর্ন সংগঠনটির। পরবর্তী সময়ে একের পর এক নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন এই ব্যবসায়ী। বাগিয়ে নিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন। এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে নারায়ণগঞ্জ জুড়ে। এরই মাঝে তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের প্রচার-প্রচারণাও। তবে হুট করে নিরাপত্তার অযুহাতে নির্বাচন করছেন না জানিয়ে মাঝ পথেই সরে দাঁড়ান তিনি।
অন্যদিকে, তার কর্মী সমর্থকরা তাকে ‘অপরিহর্য্য’ দাবি করে নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে ফিরে আসার আহবান জানিয়ে আন্দোলনেও নামেন। পরবর্তীতে সেই আন্দোলনের ইস্যু দাঁড় করিয়ে পূনরায় নির্বাচন করার ঘোষণা দেন তিনি। এভাবে নির্বাচনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়ে আবার মাঝ পথে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে পূনরায় ফিরে আসার এই ঘটনাটিকে স্ট্যান্টবাজী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন মডেল মাসুদের বিরোধী বলয়ের নেতারা।
তারা বলছেন, নিজেকে অপরিহার্য্য প্রমান করতে এবং সহানুভূতি এবং মানুষের দৃষ্টি কাড়তেই এমন স্ট্যান্টবাজীতে মত্ত হয়েছিলেন মডেল মাসুদ। তবে তার এই নাটকীয়তাই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি নির্বাচন করবেন না জানিয়ে পূনরায় প্রার্থী হিসেবে ফিসে আসার ঘোষণা দিলেও তাকে আমলে নিচ্ছে না বিএনপির হাইকমান্ড। এই আসনে বিএনপির নতুন প্রার্থী হিসেবে মহানগর বিএনপির আহবায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে বেছে নেয়া হয়েছে। তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে ধানের শীষের জন্য কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়ে গুলশানের কার্যালয়ে যেই প্রশিক্ষন সেমিনার করেছে বিএনপির হাইকমান্ড, সেই সেমিনারে কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের নির্দেশলনা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে শুভকামনা জানিয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণ করছেন।
এদিকে, প্রার্থীতা পেয়েও হারিয়ে ফেলা মডেল মাসুদ এখনো নিজেকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী দাবি করে মাঠে সরব হয়েছেন। তার অনুসারীরাও তার পক্ষে সক্রিয় রয়েছেন। এতে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে সাধারন ভোটারদের মাঝে।
সূত্র মতে, গত ৩ নভেম্বর সারাদেশের ২৩৭টি এবং ৪ ডিসেম্বর আরো ৩৬ নির্বাচনী আসনের প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা প্রকাশ করেন দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদকে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় বিএনপির তৃণমূলে। দীর্ঘ ১৭ বছর স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ ওরফে মডেল মাসুদকে ধানের শীষের প্রার্থী ঘোষণা করায় ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাছাড়া বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে মডেল মাসুদের বিভিন্ন সময়ের ছবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মডেল মাসুদের এসব ছবিতে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নেতাকর্মীদের।
সূত্র জানায়, মডেল মাসুদের এই কুকীর্তির দালিলিক প্রমাণপত্র ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখেননি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও। ফলে তাকে আগে থেকেই মার্ক করে রাখা হয়েছিল। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি কেন্দ্র নানা ভাবে দৌঁড়-ঝাপও করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত নাটকীয়তার জন্ম দিতে গিয়ে স্ট্যান্টবাজীর যেই ফাঁদ তৈরী করেছিলেন, সেই ফাঁদে তিনি নিজেই পড়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তৃণমূলের মতে, গত ১৭ বছরের আন্দোলন সংগ্রামে একদিনের জন্যও রাজপথে দেখা যায়নি মডেল মাসুদকে। বরং সে সময়ে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিদের সভা সমাবেশে প্রায়ই দেখা মিলেছে তার। দুঃসময়ের আন্দোলন সংগ্রামে যখন সারা দেশে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে তখন মাসুদুজ্জামান মাসুদ পুরোপুরি ব্যবসায়ী মেজাজে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সমান তালে ব্যবসা করেছেন, কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
গত ১৭ বছরে সারাদেশে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা সরকারের মামলা হামলায় জর্জরিত হলেও মডেল মাসুদকে কোনদিন পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ বিরক্ত করেনি। দলের দুঃসময় কেটে যাওয়ায় মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছেন এই ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগের আমলে কামানো কোটি কোটি টাকা নিয়ে নেমে পড়েন মনোনয়ন কেনার প্রতিযোগিতায়।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দোসর শিল্পপতি মাসুদকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তারা মেনে নিতে পারেননি। তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরবর্তীতে মহানগর বিএনপির আহবায়ক এ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে এই আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনিত করায় নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে। যোগ্য ব্যক্তিকেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বলে অভিমত বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের।






