নারায়ণগঞ্জ ।
,

উজ্জলকে ঘিরে সমালোচনায় সিনিয়র নেতারা
এক মন দুধে এক ফোঁটা চোনা !

বিশেষ প্রতিনিধি : জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের অন্যতম এক নির্দশন হয়ে আছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। দলের প্রশ্নে নিবেদিত ও আদর্শের প্রশ্নে আপোষহীন এই প্রয়াত নেতার জীবদ্দশায় নেই কলঙ্কের তিলক। নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে যেমন মাঠ পর্যায়ে থেকে সংগঠিত করেছেন, তেমনই অসংখ্য নেতা তৈরীতেও রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা। তবে স্বর্বজন স্বীকৃত পরিচ্ছন্ন এই রাজনীতিবীদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান ঘিরে দেখা দিয়েছে তুমুল বিতর্ক। স্থানীয় তাতীদল নেতা ইসদাইরের বিতর্কিত সিদ্দিকুর রহমান উজ্জলকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।


মূলত, কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের মত প্রথিতযশা ও বিতর্কহীন নেতার স্মরণে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে ইসদাইরের বিতর্কিত ও তাতীদল নেতা উজ্জলকে সভামঞ্চে জায়গা করে দেয়ায় তৃণমূল বিএনপির পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


মঞ্চে বিতর্কিত উজ্জলের আসনগ্রহণ করাকে বাংলার বহুল প্রচলিত এক প্রবাদ বাক্যের সাথে তুলনা করছেন সচেতন নেতাকর্মীরা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলছেন, এ যেন ‘এক মন দুধে এক ফোঁটা চোনা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মহতি ওই স্মরণ সভার তাৎপর্য ভুলুষ্ঠিত করেছে উজ্জল। আর তাঁকে পাশে নিয়ে একত্রে সভামঞ্চে বসায় অনুষ্ঠানের সভাপতি, প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করা নারায়ণগঞ্জ বিএনপি এবং যুবদলের সিনিয়র নেতারাও যেন বিদ্ধ হচ্ছেন সমালোচনার তীরে।


জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর এলাকার রাজনীতিতে তাতীদল নেতা সিদ্দিকুর রহমান উজ্জল ও তার দুই ভাই মিঠু এবং সম্রাটকে ঘিরে যেন বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। স্থানীয় রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তার, বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যবসা ও অন্তরালে অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ঘিরে চলছে সমালোচনা।


স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী ও প্রয়াত সিরাজ কমান্ডারের অনুসারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা না থাকা ব্যক্তিরা এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেদের ‘ত্যাগী’ ও ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে দলীয় দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক বলয় তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে উজ্জল ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে।


এদিকে, ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কেএম মাজহারুল ইসলাম জোসেফ। প্রধান অতিথি ছিলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি।


অনুষ্ঠানের মঞ্চে অতিথিদের সঙ্গে সিদ্দিকুর রহমান উজ্জলকে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যাওয়ার পর থেকেই স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়।


সিরাজ কমান্ডারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা (প্রবীন বিএনপি নেতারা) ও অনুসারীদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— কমান্ডার সিরাজের মত একজন পরিচ্ছন্ন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত বিএনপি নেতার স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত একজন রাজনৈতিক কর্মীকে কেন অতিথিদের সঙ্গে একই মঞ্চে স্থান দেওয়া হলো?


তাদের ভাষ্য, এতে অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।


একজন স্থানীয় বিএনপি কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সিরাজ কমান্ডারের রাজনীতি ছিল ত্যাগ ও আদর্শের রাজনীতি। তার স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দৃশ্যমান উপস্থিতি তৃণমূলের জন্য হতাশাজনক।”

দুর্দিনে নিষ্ক্রিয়, সুদিনে ত্যাগী !

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উজ্জল ও তার ভাইদের বিএনপির পক্ষে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে দৃশ্যমান সক্রিয়তা খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের তৎপরতা ও রাজনৈতিক পরিচয় বদলের প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কখনো জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, কখনো বর্তমান জেলা বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, আবার কখনো জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনির ঘনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা পরীক্ষিত কর্মীদের পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিরা যদি দলীয় নেতৃত্বের কাছাকাছি জায়গা করে নেন, তাহলে মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন কোথায়?
তাদের আরও অভিযোগ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট বলয় তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে উজ্জল। আর সেই বলয়ের মাধ্যমে ইসদাইর, কোতালেরবাগসহ আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন তিনি।

ভাইদের ঘিরে যত অভিযোগ

সিদ্দিকুর রহমান উজ্জল ও তার ভাই মিঠু এবং সম্রাটকে ঘিরে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগের আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, তাদের প্রভাববলয়কে কেন্দ্র করে এলাকায় কিশোরগ্যাং, মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছে। মাদক ও সন্ত্রাসে সয়লাব হয়ে যাওয়া ইসদাইর এবং আশপাশের অপরাধীদের গোপন ছায়া হয়ে উঠেছে তারা তিন ভাই।


এদিকে, মোট পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে উজ্জলের বড় আরো দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অতীতে একজন অয়ন ওসমান ও আরেকজন আজমেরী ওসমানের কর্মী হিসেবে দাপিয়ে বেড়াতেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।


অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ করা উজ্জলের বড় দুই ভাই বর্তমানে তার ছায়ায় নিরাপদে আছেন। এছাড়াও অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকা একাধিক ব্যক্তিদের নিজের চারপাশে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে উজ্জল। এছাড়াও এলাকার চিহ্নিত মাদক সন্ত্রাসী আকাশ ও একাধিক অপরাধী গ্রুপকেও প্রকাশ্যে শেল্টার দেয়ার অভিযোগ রয়েছে উজ্জলের বিরুদ্ধে। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের শেল্টার দেয়ার অভিযোগ রয়েছে মিঠুর বিরুদ্ধেও। তার ছেলে রাতুলকে অধিকাংশ সময়ই মাদক ব্যবসায়ী আকাশের পাশে দেখা যায় বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো।


এভাবেই বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন ব্যবসা ও খাত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উজ্জল ও তার ভাইয়েরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান উজ্জল, মিঠু ও সম্রাটের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ‘নয়া উত্থান’

স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন না, তাদের একটি অংশ এখন দলীয় নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। উজ্জলকে ঘিরেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।


তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলার প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ছবি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দৃশ্যমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে উজ্জল নিজেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। এতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


একজন প্রবীণ বিএনপি সমর্থকের ভাষায়, “রাজনীতি যদি শুধু সুদিনে পরিচয় বদলের জায়গা হয়ে যায়, তাহলে দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন তাদের মূল্যায়ন করবে কে?”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >