নারায়ণগঞ্জ ।
,

পুলিশ হেফাজতে লকাপে মোবাইল ব্যবহার ও দলীয় বক্তব্য প্রচার, ফের সমালোচনায় ওসি মাহবুব

বিশষে প্রতিবেদক : নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার লকাপে বন্দি থেকেও স্মার্টফোন ব্যবহার করে দলীয় শ্লোগাণ ও বক্তব্যের ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে নাশকতা মামলার ১০ আসামী! চোখ কপালে উঠলেও সত্যিই ঘটেছে এমন বিস্ময়কর ঘটনা।

গত ৩০ আগস্ট রাতে ফেসবুক সহ অন্যান্য অনলাইন প্লাটফর্মে ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে শুরু হয় তুমুল সমালোচনা।

প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ হেফাজতে লকাপের ভেতরে থাকা নাশকতা মামলার ১০ আসামী একটি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় নিজেদের বক্তব্য ধারণ করছেন। তারা দলীয় স্লোগান দিচ্ছেন, নিজেদের মনোবল চাঙ্গা করার মতো বক্তব্য রাখছেন এবং দলীয় নেতাদেরকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।

এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের হাতে স্মার্টফোন এলো কীভাবে?

জানা গেছে, গত শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড এলাকায় সরকারবিরোধী মিছিল ও নাশকতার প্রস্তুতির অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ।

পরদিন ৩০ আগস্ট পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা ‘পলাতক’ আজমেরী ওসমানের অনুসারী এবং লিমন ও ফয়সাল দর্পণের নির্দেশে নাশকতা ঘটানোর উদ্দেশ্যে তারা সেখানে জড়ো হয়েছিল। একই তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদেও পুলিশ তাদের ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—আবরার আহম্মেদ (১৮), ইয়াসিন (১৮), রাব্বি (২০), শিমুল (২০), ফেরদৌস (১৮), পলক (১৭), আবু বকর (১৬), তানভীর (১৫), লিমন (১৭) ও নয়ন (১৮)।

লকাপে বসেই ভিডিও!

গ্রেপ্তারের পর থানার লকাপে থাকা অবস্থায় ধারণ করা কথিত ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরই শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। কারণ, থানার লকাপে আটক ব্যক্তিদের কাছে মোবাইল ফোন থাকা এবং সেটি ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ করার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিছক কোনো ঘটনা নয় বরং পুলিশ তথা থানায় দায়িত্বরত সদস্যদের বড় ধরনের গাফলতির সামিল। যার দায় বর্তায় থানার ওসির কাঁধেই। এতে থানার হেফাজত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশ্নের মুখে পুলিশের নজরদারি

পুলিশ হেফাজতে থাকা কোনো আসামির কাছে মোবাইল ফোন থাকার বিষয়টি শুধু নিয়মভঙ্গের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা ও নজরদারির বিষয়টিও। কেননা, লকাপে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে রয়েছে একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা। সেই ফুটেজ সাধারণত থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নজরদারির আওতায় থাকে। পাশাপাশি লকাপের নিরাপত্তায় ২৪ ঘন্টাই নিয়োজিত থাকেন একাধিক পুলিশ সদস্যরা।

এতে বেশ কিছু বিষয় এবং প্রশ্ন সামনে এসেছে। তা হলো;

গ্রেপ্তারের পর আসামীদের সঠিক ভাবে তল্লাশি করা বা না করা। কেননা, তল্লাশী করা হলে তাদের কাছে থাকা মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়নি কেন? আবার তল্লাশি করা হলেও অন্য কোনো উপায়ে কী আসামীদের কাছে মোবাইল ফোন পৌছে দেয়া হয়েছে? এমনটা হয়ে থাকলে লকাপের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা তখন কোথায় ছিলেন? তবে, যদি মোবাইল ফোন আগে থেকেই তাদের কাছে থেকে থাকে, তাহলে তল্লাশির সময় সেটি ধরা পড়ল না কেন? আর যদি বাইরে থেকে কেউ ফোন পৌঁছে দিয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে সেটি লকাপের ভেতরে ঢুকল? কোনো ভাবে যদি তা গিয়েও থাকে- তাহলে লকাপের সিসিটিভি ফুটেজে তা ধরা পড়লো না কেন? থানার ওসি কিংবা নজরদারীর দায়িত্বে থাকা অন্য অফিসাররা তখন কোথায় ছিলেন? এমন অজস্র প্রশ্ন সামনে এলেও তা এখনো পরিস্কার হয়নি।

ওসির দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচনা

থানার লকাপের নিরাপত্তা ও বন্দিদের ওপর নজরদারি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফলে লকাপের ভেতর এমন ঘটনা ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বিশেষ করে ফতুল্লা মডেল থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি থানায় নাশকতার প্রস্তুতির অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা যদি পুলিশ হেফাজতে থেকেও স্মার্টফোন ব্যবহার করে ভিডিও ধারণ করতে পারেন, তাহলে থানার নিরাপত্তা ও বন্দি ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর—সেটি খতিয়ে দেখার দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।

এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা হয়ে থাকলে কার দায় কতটুকু, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে আসল রহস্য

অপরাধ বিশ্লেষকগণ ও সচেতন মহল বলছেন, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফতুল্লা মডেল থানার সিসিটিভি ফুটেজ।

গ্রেপ্তারের পর আসামিদের থানায় আনা থেকে শুরু করে লকাপে নেওয়া, তল্লাশি, মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় এবং ভিডিও ধারণের পুরো সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হলে বিষয়টির অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।

এছাড়া গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে কী কী মালামাল জব্দ করা হয়েছিল, থানার জব্দ তালিকায় মোবাইল ফোনের কোনো উল্লেখ ছিল কি না এবং লকাপে নেওয়ার আগে তাদের যথাযথভাবে তল্লাশি করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

আগেও নানা ঘটনায় বিতর্কে জড়িয়েছিলেন ওসি মাহাবুব

নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ থানা হলো ফতুল্লা মডেল থানা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হত্যা, ধর্ষণচেষ্টা, মাদক ও পারিবারিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন ঘটনায় এ থানার পুলিশের তৎপরতার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এসব ঘটনায় ওসি মাহাবুবুর আলমকে পুলিশের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিতেও দেখা গেছে। তবে লকাপের ভেতরে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের হাতে স্মার্টফোন থাকার ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে—থানার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ওসি মাহাবুবুর আলমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ব্যবস্থা নেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সচেতন মহলের প্রশ্ন, বিষয়টি কি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করবেন?

কারও দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতি কিংবা নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না— সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।

বিশেষ করে লকাপের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, মোবাইল ফোনের উৎস শনাক্তকরণ, দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের তল্লাশি সংক্রান্ত নথি যাচাই করলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >