নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে কেমন প্রার্থী বেছে নিবে বিএনপির হাইকমান্ড; সেই আলোচনা চলছে রাজনীতিকাঙ্গণে।সীমানা নির্ধারণের পর নির্বাচন কেন্দ্রীক এই আলোচনা জোড়ালো হচ্ছে। দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নবীনদের প্রধান্য দেয়া হবে; বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন মন্তব্যের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে উদীয়মান নবীন তথা যোগ্যতা সম্পন্ন কয়েকজন তরুণ নেতাদের দুয়ারে অপার সম্ভাবনার হাতছানি বইছে। ইতিমধ্যেই তারা আলোচনার তুঙ্গে আছেন।
তারা হলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খোকন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব, নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর জিএম সাদরিল।
অন্যদিকে, বিগত সময়ে আলোচনায় থাকলেও বিতর্কিত একটি মামলার দরুণ ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী বহিস্কার হওয়ায় তিনি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তবে ফতুল্লা বিএনপির একটি অংশ এখনো তার বলয় হিসেবে রাজনীতির মাঠে আছেন। ওই বলয়টি বর্তমানে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীর পক্ষে ফতুল্লা থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক রুহুল আমিন শিকদারের নেতৃত্বে রাজপথে সরব রয়েছেন। ফলে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রুহুল আমিন শিকদারকে নিয়েও ফতুল্লা বিএনপির একটি পক্ষ আলোচনা তুলেছেন। তারা বলছেন, নির্বাচনের পূর্বে যদি রিয়াদ চৌধুরীর বহিস্কারাদেশ তুলে নেয়া না হয়, তাহলে তার স্থলে রুহুল আমিন শিকদারকে ভোটের মাঠে তুলে ধরা হতে পারে।
এদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কেন্দ্রীক আলোচনায় উঠে আশা নেতাদের মধ্যে গোলাম ফারুক খোকন, মাশুকুল ইসলাম রাজীব, মশিউর রহমান রনি, জিএম সাদরিল সহ আরও অনেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রাথমিক গুড বুকে জায়গা করে নিয়েছেন। রাজনীতিতে তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার বিষয়ে দলের হাইকমান্ড অবগত রয়েছেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্যের মাধ্যমে জানিয়েছেন, দলের সক্রিয় ও যোগ্যতা সম্পন্ন নেতাদের সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করা হবে। সেই সুরে সুর মিলিয়ে সম্প্রতি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, মনোনয়নের ক্ষেত্রে তরুন নেতাদের প্রাধান্য দেয়া হবে। এতে করে উল্লেখিত নেতাদের মাঝে জেগেছে আত্মবিশ্বাস, প্রত্যাশা ও প্রবল সম্ভাবনার আলো। ফলে ইতিমধ্যেই তারা জনসম্পৃক্ত নানা কল্যাণমূলক সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সক্রিয়তা বাড়িয়েছেন। তাদের কর্মী ও সমর্থকদের পাল্লাও দিন দিন ভারি হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট নানা সভা সেমিনার কিংবা কর্মকাণ্ডে তাদের সম্মানজনক অংশগ্রহণও চোখে পড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে তারা পৃথক ভাবে প্রধান অতিথির আসনও অলংকৃত করে চলেছেন। এতে করে তাদের কর্মী সমর্থকদের মাঝে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির পাশাপাশি নানা জল্পনা-কল্পনা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে।
উল্লেখ্য, রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের বাসিন্দা গোলাম ফারুক খোকন জেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি জেলা বিএনপির বর্তমান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপুর বলয়ে থেকে রাজনীতি করলেও রাজনীতিকাঙ্গণ তথা রূপগঞ্জে গোলাম ফারুক খোকনের ব্যাপক কর্মী-সমর্থক রয়েছে। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ধরে রাখায় উদীয়মান নেতা হিসেবে গোলাম ফারুক খোকনকে নিয়ে তার কর্মী সমর্থকদের মাঝে নানা জল্পনা কল্পনা রয়েছে। গুঞ্জন চলছে, কোনো কারণে যদি নারায়ণগঞ্জ-১ আসন থেকে রূপগঞ্জের মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু মনোনয়নের লড়াই থেকে সড়ে দাঁড়ান, তাহলে তার স্থলে তিনি গোলাম ফারুক খোকনকে সমর্থন করে তার পক্ষে মনোনয়নের জন্য নিজের শক্তি সামর্থ্যরে প্রয়োগ করবেন।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জের বিএনপি অঙ্গণে এখন অন্যতম এক নাম হয়ে উঠেছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব। ছাত্রদলের রাজনীতি ও নেতৃত্ব দেয়ার সময়কাল থেকেই নিজেকে পৃথক ভাবে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন সময়ের আলোচিত এই বিএনপি নেতা। ভিপি রাজীব হিসেবে অধিক পরিচিত এই নেতাকে রাজপথের পরীক্ষিত হিসেবে স্বীকার করেন তার বিরোধী বলয়ের লোকেরাও। বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে রাজীব তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমান জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটিতে আসার পর রাজীব কেবল ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ কিংবা মহানগর বন্দরই নয় বরং তার বিচরণ ছড়িয়েছেন সেই সোনারগাঁ কিংবা রূপগঞ্জ আড়াইহাজারেও। ব্যাপক কর্মী সমর্থক থাকায় সম্ভাবনাময়ী এই উদীয়মান তরুণ নেতাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সমানতালে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, উদীয়মান তরুন নেতাদের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। সম্ভাবনাময়ী এই যুবদল নেতা ইতিমধ্যেই নিজের গ্রহণযোগ্যতা, সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ, জনপ্রিয়তা ও জন-সম্পৃক্ততার স্বাক্ষর রেখেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতেও সম্পৃক্ত রয়েছেন। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালীন মশিউর রহমান রনি নিজেকে আলাদা ভাবে পরিচিতি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দলে তার আত্মত্যাগ ও নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলার মত জায়গা নেই বলে মনে করেন বিএনপির পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা। একের পর মামলা, দিনের পর দিন জেল খাটা সহ গুমেরও শিকার হয়েছিলেন আলোচিত এই নেতা। আওয়ামী লীগের শাসনামলে যখন বিএনপির কেউ কেউ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালিন এমপি এমপি শামীম ওসমানের সাথে তলে তলে আঁতাত করেছিলো, তখন মশিউর রহমান রনি অনেকটা চোখে চোখ রেখে শামীম ওসমান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রকাশ্য সমালোচনা করে বেড়াতেন। ভয়-ডরহীন এই নেতাকে নিয়ে এবার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন তার কর্মী সমর্থক ও এলাকার বাসিন্দারা। মশিউর রহমান রনিও এলাকার নানা সমস্যা সমাধানে জনবান্ধব নেতা হিসেবে এগিয়ে আসছেন। ইতিমধ্যেই তিনি তার ব্যক্তিগত অর্থায়নে ফতুল্লার ইসদাইর, মাসদাইর, শাসনগাঁও, বিসিক, মুসলিমনগর, লালপুর, পৌষারপুকুরপাড় সহ আশপাশের এলাকায় খাল খনন, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সড়ক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখে রেখে সর্ব মহলে প্রসংশিত হয়েছেন। তাকে ঘিরে ফতুল্লাবাসীর মাঝে তুমুল আলোচনা চলছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সীমানা নির্ধারনে মশিউর রহমান রনির আপিলকে গুরুত্বও দিয়ে নির্বাচন কমিশন। গুঞ্জন চলছে, তার প্রস্তাবনাতে নির্ধারণ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সীমানা। এতে করে রনি আগামী নির্বাচনের পথে বিভিন্ন সূচকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে বলেও আলোচনা চলছে তার অনুসারীদের মাঝে।
এদিকে, ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর জি.এম সাদরিল। সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এবারের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী তরুণ নেতাদের মধ্য থেকে উদীয়মান ও জনবান্ধব নেতা হিসেবে আলাদা স্বাক্ষর রেখেছেন এই বিএনপি নেতা। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের পুত্র। তবে কেবল পিতার রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা খ্যাতিতেই ভর করে নয়, বরং রাজনীতিকাঙ্গণে নেতৃত্বগুণ, দক্ষতা, যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা ও জনকল্যাণকর কাজে জিএম সাদরিল নিজেকে প্রমাণ করে যাচ্ছেন। নানা বাধা-বিপত্তি থাকলেও তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে একাধিকবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কার্যকরি ভূমিকার দরুণ রেখেছেন সফলতার স্বাক্ষর। ফলে জাতীয় নির্বাচন ছাড়াও আগামীর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জিএম সাদরিল বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে আওয়াজ তুলতে পারেন বলে মনে করেন তার কর্মী সমর্থকরা। তারা বলছেন, পতিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা অংশ, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড, ভূইঘড়, জালকুড়ি, সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী এলাকার প্রধান সড়ক এমনকি শহরের রাজপথেও জিএম সাদরিলের নেতৃত্বে বিএনপি এবং অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। ফলে তিনিও কেন্দ্রীয় নেতাদের সু-নজরে রয়েছেন বলে বিভিন্ন আলোচনায় চাউর হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির নীতি নির্ধারকরা যদি প্রার্থী নির্বাচনে ভুল করে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে এর মাশুল গুনতে হবে দলটিকে। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ফলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ণকে গতিশীল করতে এবং কাঙ্খিত সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দেয়া সহ নারায়ণগঞ্জের হারানো আসনগুলো পূনঃরুদ্ধার করতে বিএনপির যোগ্যতা সম্পন্ন তরুণ নেতাদের সুযোগ দেয়ার বিকল্প নেই। এবার বাস্তবিক অর্থেই সেই পথে হাঁটবে কিনা বিএনপির নীতিনির্ধারকরা, তা দেখা যাবে আগামীতেই।






