কুষ্টিয়া প্রতিনিধি//এস, এম বাদল: বাংলাদেশের তার ও কেবলশিল্পের পরিচিত নাম বিআরবি কেবলস। উদ্যোক্তা আলহাজ্ব মুজিবর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭৮ সালের ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়ার বিসিক শিল্পনগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয় বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। দেশীয় বাজারে তার ও কেবলের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮০ সালের ২৩ জানুয়ারি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়।
শুরুর পর থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন ও কারখানা সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বিআরবি। নব্বইয়ের দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পর ২০০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চচাপের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ব্যবহৃত কেবলসহ বিভিন্ন নতুন পণ্য উৎপাদনে যুক্ত হয়। পর্যায়ক্রমে পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয় টেলিফোন, অপটিক্যাল ফাইবার ও জাহাজে ব্যবহারের উপযোগী কেবলও।
প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত কেবল বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা, রেলওয়ে, বন্দর, শিল্পকারখানা ও আবাসন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। কুষ্টিয়ায় গড়ে ওঠা এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশের বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখে চলেছে।
২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করছে বিআরবি কেবলস। স্থানীয় উদ্যোগ থেকে বিস্তৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উত্তরণের এই পথচলা বাংলাদেশের দেশীয় শিল্পবিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
চ্যালেঞ্জ নেয়া কারিগর মজিবর রহমান
দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আলোচিত নাম বিআরবি ক্যাবল
দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও এক আলোচিত নাম বিআরবি ক্যাবলের। এ গ্রæপের কর্ণধার আলহাজ মো. মজিবর রহমান। তিনি চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন। সততা, ব্যবহার আর শ্রমের বিনিময়ে এ চ্যালেঞ্জকে তিনি জয়ও করেছেন এবং সফলতাকে এনেছেন হাতের মুঠোয়। কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে বেড়ে ওঠা। ফলে ছোট থেকে হিসাবের হাত একেবারে পাক্কা। চল্লিশ বছর ধরে এ পাক্কা হিসাবি মজিবর রহমান ব্যবসাকেও নিয়ে গেছেন পাক্কা খুঁটিতে। অন্যতম বিশ্বে বাংলাদেশের শীর্ষে এ সেøাগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তর তর করে।
১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন বিআরবি (বজলার রহমান অ্যান্ড ব্রাদার্স) ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আস্তে আস্তে দেশের বাজারে অবস্থান করে নেয় প্রতিষ্ঠানের পণ্য। তারপর দেশের বাইরে নজর দেন তিনি। এখন বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলাদেশের সুনাম ও মর্যাদাকে শীর্ষে তুলে ধরছেন বিআরবি গ্রæপ তাদের উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে। আর দেশের বেকারত্ব মোচন, অর্থনীতির গতি সঞ্চার ও দেশের রফতানি খাতকে এগিয়ে নিচ্ছেন সমান তালে। মজিবর রহমান প্রতিষ্ঠানটির চেয়াম্যান। তার মতে, দেশে কোনো কিছু করা না গেলে, বাইরে গিয়েও কিছু করা যায় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ বিআরবি গ্রæপের অর্জন আরো সূদুরপ্রসারী করতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এ গ্রæপে বর্তমানে ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৬ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছে এখানে। এর মধ্যে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ, কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ, বিআরবি পলিমার, বিআরবি সিকিউরিটিজ, টিপিটি ক্যাবলস, লাভলী হাউজিং, কিয়াম সিরাতুন্নেসা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, বিআরবি অ্যানার্জি, বিআরবি এয়ার, বিআরবি ট্রাভেলস, গ্যাস্ট্র লিভার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট লিমিটেড।
জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের পাশাপাশি দেশে শিল্পায়নে পিছিয়ে থাকা জনপদ কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ জেলায় রূপান্তরেরও অন্যতম কারিগর এ বিআরবি গ্রæপ। স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই কুষ্টিয়া অঞ্চলে নতুন করে শিল্পায়নের সূচনা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুষ্টিয়ার খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান মোহিনী মিল বন্ধ হয়ে যায়। নাজুক হয়ে পড়ে কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিলের অবস্থাও। জেলার বৃহৎ কর্মস্থানের এক্ষেত্র দুটি ভঙ্গুর হয়ে পড়লে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এ জেলা। এমন অবস্থায় নানা রকমের ঝুঁকি সত্তে¡ও নতুন করে শিল্পকারখানা দাঁড় করানোর চেষ্টা শুরু করেন মজিবর রহমান। এ প্রচেষ্টা বাস্তবরূপ লাভ করে ১৯৭৮ সালের ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়া শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণ বিসিক শিল্প নগরীতে বৈদ্যুতিক ওয়্যারস ক্যাবল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দেশে ও বিশ্ব বাজারের বৈদ্যুতিক ক্যাবলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯
৯৫ সালে কোম্পানির প্রসার ঘটিয়ে বিআরবি ক্যাবলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ইউনিট-২ স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ও আকর্ষণীয় মেটালিক পণ্যসামগ্রী রান্নাঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য মজিবর রহমান ১৯৯০ সালে কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে কুষ্টিয়া বিসিক শিল্প নগরীতে আরো একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কুষ্টিয়ায় ১৯৯২ সালে বিআরবি গ্রæপের অন্তর্ভুক্ত এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ নামে আরো একটি প্রকৌশল, ঢালাই, প্লাইউড ও মেলামাইন বোর্ড কারখানা প্রতিষ্ঠিত করেন গ্রæপটি। কৃষিপ্রধান দেশর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উন্নত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিআরবির স্বপ্নদ্রষ্টা আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৯৭ সালে বিসিক শিল্প নগরী কুষ্টিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন বিআরবি পলিমার লিমিটেড। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গ্রাহক চাহিদা মেটানোসহ কর্মসংস্থানের জন্য ২০০৯ সালে নতুন প্লান্ট স্থাপন করে উৎপাদন করছেন বৈদ্যুতিক ফ্যান। যার নাম লাভলী ফ্যান, যা বাজারে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। টেকসই ও মজবুত হওয়ায় লাভলী ফ্যান অল্প সময়ে মানুষ গ্রহণ করেছে। বর্তমানে এ ফ্যান বাংলাদেশের এক নম্বর ব্র্যান্ড হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে।
২০১১ সালে বিআরবি গ্রæপে যুক্ত হয় আর একটি নতুন অধ্যায়। বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড মেরিন ক্যাবল উৎপাদন করে ব্যবসায় নজির স্থাপন করায় কোম্পানি ব্যাপক সুনাম অর্জন করে।
২০১১ সালে বিসিক শিল্প নগরীর মূল হাইওয়েতে এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ফিলিং স্টেশন স্থাপন করেন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চয়তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিসিক শিল্প নগরীর বিআরবি চত্বরে ২০০৯ সালে স্থাপন করেন বিআরবি অ্যানার্জি লিমিটেড। এ বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে বিআরবি গ্রæপের সব প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনে গতিশীলতা ফিরে এসেছে। অন্যদিকে ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কে ২০০০ সালে ১০তলা বহুতল ভবন বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স ‘লাভলী টাওয়ার’ স্থাপন করেন। মজিবুর রহমান কুষ্টিয়ায় কিয়াম সিরাতুননেছা মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করে দরিদ্র ছাত্রদের বিনামূল্যে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। প্রতিষ্ঠানের শুরু সম্পর্কে মজিবর রহমান বলেন, মজিবর রহমান বলেন, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে ও স্বনির্ভর কুষ্টিয়া প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে বিআরবি গ্রæপ। দি কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাজি মো. রবিউল ইসলাম বলেন, কুষ্টিয়া শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য যতটা বিখ্যাত, শিল্পায়নের ইতিহাস ঠিক তার উল্টো। মোহিনী মিলের প্রতিষ্ঠার পূর্বে উল্লেখযোগ্য আর কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে ওঠেনি। মোহিনী মিল প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলে বিরাট অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনে।
দি কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহ-সভাপতি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি এস এম কাদেরী শাকিল বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বিআরবি থেকে বড় বড় গ্রæপ অব কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যেও আমাদের এ মফস্বল এলাকা থেকে ব্যবসা করে যথাযথ সম্মান বয়ে আনতে পেরেছে এ বিআরবি গ্রæপ। শুধু তাই নয়, এ জেলার বেকারত্ব মোচনে তিনি যে ভ‚মিকা পালন করে চলেছেন তা অনস্বীকার্য। শুধু বিআরবির কারণে কুষ্টিয়া জেলাবাসী গর্বিত নয়, বাংলাদেশও গর্ববোধ করে।





