চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ব্যক্তি পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার দিন শেষ; বিএনপি সরকারের অধীনে স্বজনপ্রীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে কোনো ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে কঠোর বার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) চট্টগ্রামে কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ বার্তা দেন।
তিনি বলেন, ‘কে কার সঙ্গে পরিচিত’— এটি ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার কোনো মাপকাঠি হবে না। ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক, এমনকি সরকারের কোনো মন্ত্রী হলেও পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ থাকবে না।
আমির খসরু বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচিত সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে প্রথমে স্থিতিশীল এবং পরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে কাজ করছে। এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসার পথে প্রশাসনিক জটিলতা ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’ নিশ্চিত করতে বাজেটেই ডিরেগুলেশনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রেগুলেশন ও প্রক্রিয়াগত জটিলতার মাধ্যমে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, তা ধাপে ধাপে সরিয়ে ফেলা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কাস্টমস ও বন্দরের জটিলতা বাড়লে পণ্য খালাসে সময় লাগে, ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। তাই পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রতিটি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তও হয়েছে। শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই থেমে না থেকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
আমির খসরু বলেন, দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এবার কাস্টমস ও বন্দরকে সমন্বিতভাবে কাজ করানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে পণ্য খালাস ও রপ্তানির সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে বাড়বে কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা।
কাস্টমস চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনার ও আটকে থাকা পণ্য প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের জটিলতায় কাস্টমস এলাকায় বিপুলসংখ্যক পণ্য ও কনটেইনার আটকে রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ পণ্যসহ বিভিন্ন কারণে খালাস না হওয়া চালানও রয়েছে। এসব জট দ্রুত নিরসন করে কাস্টমস চত্বরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পণ্য খালাস কিংবা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয়, ক্ষমতা বা প্রভাব কোনোভাবেই বিবেচনায় আসবে না। কারও জন্য আলাদা সুবিধা বা পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা রাখা হবে না।
চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইন থেকে চট্টগ্রামে এসে স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছেন। এটি চট্টগ্রামকে ঘিরে এডিবির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বই তুলে ধরে।
আমির খসরু বলেন, চট্টগ্রামকে শুধু লজিস্টিকস হাব হিসেবে নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিকস অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি আঞ্চলিক উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে বিকেলে স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে চট্টগ্রামের উন্নয়নসংক্রান্ত মতামত নেওয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, অংশীজনদের বক্তব্য ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া হবে। চট্টগ্রামের আগামী দিনের অর্থনৈতিক বিকাশে এটি বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।





