নারায়ণগঞ্জ ।
,

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ

ইতিহাসের এক চিরন্তন ও নির্মম সত্য হলো, সে বিপ্লবের রক্তকে যেমন স্বর্ণাক্ষরে স্মরণে রাখে, তেমনি বিপ্লব-পরবর্তী প্রতিশ্রুতিভঙ্গ কিংবা আদর্শের বিচ্যুতিকেও কখনো ক্ষমা করে না। ফরাসি বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর পর ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়েরের রক্তক্ষয়ী ফ্রান্স থেকে শুরু করে আধুনিক আরবের তপ্ত মরুভূমিতে জেগে ওঠা ‘আরব বসন্তের’ ভগ্নস্বপ্ন পর্যন্ত—ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক আমাদের একটি মৌলিক সত্যই বারবার মনে করিয়ে দেয় : রাজপথে বুক পেতে দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনকে উৎখাত করা যতখানি কঠিন ও আত্মত্যাগের, উৎখাত-পরবর্তী শূন্যতায় সেই গণআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া তার চেয়েও বহুগুণ কঠিন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনি এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি, যেখানে একদিকে বিপুল প্রত্যাশা, অন্যদিকে সেই প্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ।

দুই বছর আগে দেড় হাজারেরও বেশি তরুণের তাজা রক্ত আর অগণিত ছাত্র-জনতার আজীবনের পঙ্গুত্ব ও অশ্রুর বিনিময়ে যে অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য কখনোই নিছক একটি সরকারের পতন বা ব্যক্তিবদলের সংকীর্ণ ফ্রেমে বন্দি ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার থেকে ছড়িয়ে পড়া সেই সর্বাত্মক গণজাগরণের ভেতরের দাবিগুলো ছিল অনেক বেশি গভীর ও কাঠামোগত। সাধারণ মানুষ ও রক্তাক্ত তারুণ্য সেদিন চেয়েছিল সমগ্র রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার, যুগ যুগ ধরে চলা বিচারহীনতার সংস্কৃতির চিরতরে অবসান, গুম-খুন-নির্যাতনের জবাবদিহি এবং সর্বোপরি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক ব্যবস্থা, যেখানে আর কখনো ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান সম্ভব হবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও (আইসিজেআর-২) এই সত্যটি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে, যার প্রতিপাদ্যই ছিল ‘জবাবদিহি, সংস্কার ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’। সেই ৩৬ দিন ছিল আসলে এক দীর্ঘ ও বন্ধুর যাত্রার সূচনামাত্র—যে যাত্রা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জাতির দীর্ঘদিনের ক্ষত সারিয়ে তোলার। কিন্তু আজ দুই বছর পর অবধারিতভাবেই প্রশ্ন জাগে, সেই স্বপ্নযাত্রা কতদূর এগোল, নাকি রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলল?

বিগত দুই বছরের হিসাব-নিকাশে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিছু দৃশ্যমান ও ঐতিহাসিক অর্জন আমাদের সামনে বাস্তব রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী অন্ধকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে দেশ একটি নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচনি উত্তরণের পথ প্রত্যক্ষ করেছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ দীর্ঘ সময় পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে; জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তার অন্যতম শরিক হিসেবে সংসদে একটি কার্যকর বিরোধী কণ্ঠস্বর গড়ে তুলেছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের একতরফা রাজনীতির পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এবং একটি জবাবদিহিমূলক সংসদীয় বিন্যাস ফিরে আসা নিঃসন্দেহে জুলাই গণঅভ্যুত্থানেরই ফসল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি নীরব বিজয় অর্জন করেছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ব্যাংক খাতের গভীর সংকট, বিপুল অর্থ পাচার ও আকস্মিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের তীব্র ধকল সত্ত্বেও অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান যেভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন—দেশের আঠারো কোটি মেহনতি মানুষ নিজেদের অদম্য শ্রমে এই অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছেন; তাই ‘সবই শেষ হয়ে গেছে’ ধরনের হতাশাবাদী প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই।

তবে এই অর্জনের উল্টো পিঠেই জমা হয়ে আছে অপূর্ণতার দীর্ঘ তালিকা, যা রাজনৈতিক অঙ্গনকে প্রতিনিয়ত উত্তপ্ত করে তুলছে। অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ পরিবারগুলোর একমাত্র আকুতি হলো স্বৈরাচারের দোসরদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেই বিচারপ্রক্রিয়া এতটাই শ্লথ ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার যে, শহীদদের স্বজনরা আজ চরমভাবে আশাহত। শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে সম্প্রতি ঝরে পড়েছে সেই গভীর বেদনা—বিচার বিলম্বিত হচ্ছে, আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ধারণ করে গঠিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়েও চলছে নানা টালবাহানা ও কালক্ষেপণ। মূলত এই ‘টালবাহানা’ ও প্রতিশ্রুতিভঙ্গের আশঙ্কাই আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তাপের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই উত্তাপের উৎস অনুসন্ধানে গেলে দেখা যায়, ‘জুলাই সনদ’ ছিল আমাদের ইতিহাসে রাজনৈতিক ঐক্যের এক বিরল মুহূর্ত। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে প্রায় পঁচিশটি প্রধান রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নে এক টেবিলে বসে ঐতিহাসিক সনদে সই করেছিল। এরপর সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গেই আয়োজিত একটি গণভোটে জনগণের বিশাল অংশ সংস্কারের পক্ষে দ্ব্যর্থহীন রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ঐকমত্যের সেই সোনালি সেতু আজ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে এসে গভীর বিভক্তির খাদে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও জোরালো। এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি কড়া ভাষায় অভিযোগ তুলেছেন, জনগণ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও ক্ষমতাসীন দল সেই গণরায়কে কার্যত উপেক্ষা করছে এবং সনদের মূল ধারাগুলো এখনো বাস্তবায়ন করেনি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও যদি আগের মতোই লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দুঃশাসনের সংস্কৃতি বহাল থাকে, তবে জুলাইয়ের তরুণদের এই আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক মূল্য কোথায়? একই সুর জামায়াতের কণ্ঠেও; তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যকর পথ খুঁজে বের করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারেরই। বিরোধী শিবির তাই মাসব্যাপী গণপদযাত্রা ও ‘জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে।

বিপরীত দিকে, ক্ষমতাসীন দলের ব্যাখ্যাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, তাদের সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই সরকারই একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করবে। এর পাশাপাশি তিনি পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা জোটের একক সম্পত্তি নয়; এটি ছিল আপামর জনসাধারণের গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। অথচ কিছু মহল এই আন্দোলনকে নিছক ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে চাইছে এবং সনদের নানা ধারার অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ঠিক এই দুটি পরস্পরবিরোধী বয়ানের মাঝখানেই আজ আটকে আছে বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি। এক পক্ষ যখন বলছে ‘জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হচ্ছে না’, অন্য পক্ষ তখন বলছে ‘রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে’। বাস্তবতার নিরিখে সত্য সম্ভবত এই দুয়েরই এক জটিল সংমিশ্রণ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি প্রাচীন সত্য হলো—ক্ষমতা দ্রুততার সঙ্গে তার অধিকারীকে ভুলিয়ে দেয়, সে কোন প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে ও কত মানুষের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছিল। বর্তমান সরকারকে ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণে রাখতে হবে। মানুষ যাদের বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে, তাদের সংস্কারের বিপক্ষে নয়, বরং জুলাইয়ের চেতনার অগ্রনায়ক হিসেবেই দেখতে চেয়েছে। সরকারের প্রথম ও প্রধান বিচ্যুতি হলো গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ার চরম শ্লথগতি। যে আন্দোলনের মূল ভিত্তিই ছিল বিচারহীনতার অবসান, সেখানে দুই বছর পরও শহীদ পরিবারকে বিচারের আশায় প্রহর গুনতে হচ্ছে। দ্বিতীয় বিচ্যুতি সংস্কারের প্রশ্নে দৃশ্যমান দ্বিধা এবং আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতার বিতর্ক; সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যদি সত্যিই জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তবে তা দ্রুতই জনআস্থার ভিত্তিকে ক্ষয় করবে। তৃতীয়ত, তৃণমূলে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও পুরোনো অপসংস্কৃতির পুনরাবির্ভাবের যেসব ঘটনা ঘটছে, তা নির্মূল করতে হবে।

তবে এ সংকটের সব দায় একতরফাভাবে সরকারের ওপর চাপালে প্রকৃত ভারসাম্য বজায় থাকে না। দায়িত্বশীল রাজনীতির দাবিতেই বলতে হয়, বিরোধী দলগুলোর চাপ প্রয়োগেরও একটি সীমারেখা থাকা বাঞ্ছনীয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সমগ্র জাতির যৌথ অর্জন—কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া উত্তরাধিকার নয়। এই পবিত্র স্মৃতিকে যদি প্রতিদিনের ক্ষমতার দর-কষাকষির সাধারণ মুদ্রায় পরিণত করা হয়, তবে তা শহীদের রক্তের অবমাননার শামিল। সুস্থ গণতন্ত্রে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি বৈধ অধিকার, কিন্তু সেই চাপের নামে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উত্তাপ প্রায়ই বিপরীত ফল আনে। প্রতিটি ইস্যুকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত করা, প্রতিটি মতপার্থক্যকে ‘ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে সস্তা ট্যাগ দেওয়া, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের নিয়ে পরিকল্পিত অপপ্রচার ও পাল্টা অপপ্রচারের বিষবাষ্প ছড়ানো—এসব জাতিকে ক্লান্ত এবং বিভক্ত করে ফেলে। আর এই কৃত্রিম বিভক্তি শেষ পর্যন্ত এমন অস্থিতিশীলতার দরজা খুলে দেয়, যেখানে গণতান্ত্রিক শক্তি নয়, বরং পর্দার আড়ালের অগণতান্ত্রিক শক্তিই লাভবান হয়। ইতিহাস আমাদের এই সাক্ষ্যই দেয় যে, বিপ্লবের সন্তানরা যখন ক্ষমতার লোভে একে অন্যকে গ্রাস করতে শুরু করে, তখন প্রতিবিপ্লবই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের অট্টহাসি হাসে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের পথ খুঁজে বের করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রথমত, সনদ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারকে মুখের কথার চেয়ে কাজের সততা ও দৃশ্যমান আন্তরিকতা দেখাতে হবে; শুধু প্রতিশ্রুতির অক্ষর পালনের ঘোষণাই নয়, একটি সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে জনগণ প্রতিটি সংস্কারের অগ্রগতি নিজ চোখে দেখতে পারে। দ্বিতীয়ত, শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে—কারণ এটিই এই অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার কোনো দলের নির্বাচনি এজেন্ডা নয়, এটি এক দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প; তাই একে সংকীর্ণ দলীয় জয়-পরাজয়ের হিসাব থেকে মুক্ত করে সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কোনো একটি নির্বাচনি চক্রের জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য এক বিনিয়োগ—এই দূরদৃষ্টি উভয় পক্ষকেই রাখতে হবে। চতুর্থত, রাজনীতির সমস্ত উত্তাপকে রাজপথের সহিংস সংঘাত নয়, সংসদের অভ্যন্তরে গঠনমূলক ও যুক্তিপূর্ণ বিতর্কে রূপান্তরিত করতে হবে; যে সংসদ জুলাইয়ের রক্তে পুনর্জন্ম লাভ করেছে, সেই সংসদই হোক মতপার্থক্য নিরসনের মূল মঞ্চ। সর্বোপরি, ক্ষমতার এই টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও জানমালের নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক তরজার নিচে চাপা পড়তে দেওয়া না হয়। জুলাইয়ের সাহসী তরুণরা শুধু একটি সরকারের পতন চায়নি—তারা চেয়েছিল বৈষম্যহীন, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ একটি নতুন বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ নির্মাণই হোক ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় শিবিরের অভিন্ন অঙ্গীকার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, স্বৈরাচারের ভয়ের প্রাচীর চিরস্থায়ী নয়; নিরস্ত্র ও দেশপ্রেমিক তারুণ্যের অদম্য সাহসের কাছে যেকোনো সশস্ত্র স্বৈরাচারও শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই অভ্যুত্থান একই সঙ্গে আজ আমাদের জীবিতদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে এক গৌরবময় অথচ গুরুভার দায়—শহীদের রক্তের ঋণ শোধের দায়। সেই ঋণ শুধু আনুষ্ঠানিক শোকসভা, স্মারক বক্তৃতা আর জমকালো বার্ষিকী পালনে শোধ হয় না; শোধ হয় তখনই, যখন আমরা প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলোর বাস্তব রূপ দিতে পারব, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারব এবং প্রতিটি প্রান্তিক মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন ঘটাতে পারব। চলমান এই রাজনৈতিক উত্তাপ যদি জাতিকে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে, তবে তা কল্যাণকর; আর তা যদি শুধু ক্ষমতার আর সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বে পর্যবসিত হয়, তবে ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজকের নেতৃত্বকে কোনো দিন ক্ষমা করবে না। জুলাইয়ের অমর শহীদরা নিজেদের রক্ত দিয়ে যে গভীর প্রশ্নটি এঁকে দিয়ে গেছেন, তার একটি সৎ উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আজ সরকার, বিরোধী দল ও প্রতিটি জীবিত সচেতন নাগরিকের। প্রশ্নটি সহজ, অথচ উত্তর দেওয়া ততটাই কঠিন : আমরা কি সত্যিই আত্মত্যাগের পরিচ্ছন্ন আলোয় একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে প্রস্তুত, নাকি ক্ষমতার নতুন সমীকরণে শুধু পুরোনো জরাজীর্ণ ব্যবস্থাটাকেই নতুন মুখোশে ফিরিয়ে আনছি? এই একটিমাত্র সৎ উত্তরের ওপরই চূড়ান্তভাবে নির্ভর করছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ভবিষ্যৎ রূপরেখা।লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >