নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে হাইওয়ে পুলিশে বদলির আদেশ জারি হওয়ার ১৬ দিন পেরিয়ে গেলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি আজও। তিনি এখনো নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বদলির আদেশ জারির ১৬ দিন পরও কেন তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন—এ নিয়ে জেলার সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত ১২ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীকে হাইওয়ে পুলিশে বদলি করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলায় নতুন পুলিশ সুপার পদায়নসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বড় ধরনের রদবদল করা হয়। প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে আদেশটি জনস্বার্থে জারি এবং অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু বদলির আদেশ জারির পরও নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বে রয়েছেন মিজানুর রহমান মুন্সী। এখনো তাকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এমনকি জেলা পুলিশের সরকারি ওয়েবসাইটেও বর্তমানে তাঁকেই পুলিশ সুপার হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— সরকারি প্রজ্ঞাপনে বদলির আদেশ হওয়ার পরও কেন নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি বর্তমান এসপি? বদলির আদেশ বাস্তবায়নে কি কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা জটিলতা রয়েছে? নাকি নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ?
তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মাত্র নয় মাসেই বদলি!
মিজানুর রহমান মুন্সী ২৫তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। কর্মজীবনে তিনি কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পিবিআই নোয়াখালী জেলার পুলিশ সুপার এবং পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর তাঁকে নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হয় এবং ২৯ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই হিসাবে নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় নয় মাসের মধ্যেই তাঁর বদলির আদেশ আসে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
এদিকে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, কিশোর ও সন্ত্রাসী গ্রুপের দৌরাত্ম্য এবং সংঘাত-সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান চললেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে আরও দৃশ্যমান এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অবশ্য পুলিশ বলছে, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ২৭ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসপি মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, মাদক নির্মূলে পুলিশের অভিযান ধারাবাহিকভাবে চলছে এবং মাদক সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নারায়ণগঞ্জে চৌকশ ও দক্ষ এসপি চান সচেতন মহল
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক জেলা। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত।
সচেতন নাগরিকদের মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার পুলিশ প্রশাসনে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও চৌকশ নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের ধরন ও বিস্তার বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের সক্রিয় রাখা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে—এমন একজন পুলিশ সুপার প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, একজন পুলিশ সুপারের বদলির আদেশ হলে সেটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অংশ। আবার কোনো কারণে আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তার কারণও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি আদেশের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
‘বদলি হয়েও বহাল’— যেকারণে বাড়ছে আলোচনা
নারায়ণগঞ্জে এখন আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে মিজানুর রহমান মুন্সীর বদলির আদেশ। একদিকে প্রজ্ঞাপনে তাঁকে হাইওয়ে পুলিশে বদলি করা হয়েছে, অন্যদিকে তিনি নারায়ণগঞ্জেই দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আসলে কী প্রক্রিয়া চলছে—তা জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে সচেতন মহলে।
বিশ্লেষকদের মতে, বদলির আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপর্যায়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এসপি কবে দায়িত্ব নেবেন কিংবা বর্তমান এসপির বদলি আদেশে কোনো পরিবর্তন আসছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।







