নারায়ণগঞ্জ ।
,

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে দ্রুত বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ

মাত্র কয়েক লাইনে সাজানো এক পদত্যাগপত্রেই যেন গোটা ফুটবলবিশ্বের ক্ষোভ প্রতিধ্বনিত হলো! শুক্রবার সকালে কার্লোস কর্ডেইরো ফিফার উপদেষ্টার পদ ছাড়ার মাধ্যমে একটা বার্তাও দিলেন—এটা নেহাত সাধারণ বিতর্ক নয়, বরং সংকট। যার সূচনা হয়েছিল অতি মুনাফার লোভে ফিফা বিশ্বকাপসহ মেজর টুর্নামেন্টগুলো শেয়ার আকারে বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে।

এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এএফসি) প্রেসিডেন্ট শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দ্রুতই ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার (উয়েফা) প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার শেফেরিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন—ফিফা এই পদক্ষেপ থেকে সরে না এলে বিশ্বকাপ বয়কট করবে ইউরোপ। চরম বিরোধিতার পরও ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় বলেই মনে হচ্ছে। এ অবস্থায় নড়েচড়ে বসার মতো ঘটনা ছিল কর্ডেইরোর পদত্যাগ; যিনি এক সময় ছিলেন ইনফান্তিনোর অত্যন্ত আস্থাভাজন। ২০২১ সালে তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফিফার ভবিষ্যৎ রূপরেখা সাজানোর। সেই ব্যক্তিই আজ ফিফার সিদ্ধান্তকে আখ্যা দিলেন এক ভয়াবহ ভুল হিসেবে, ‘এই চুক্তি ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্যও বিপজ্জনক।’ সাবেক ব্যাংকার এ কর্মকর্তা স্পষ্ট করে দিলেন, ‘প্রস্তাব তৈরিতে আমার কোনো হাত ছিল না, বরং আমি এ পদক্ষেপের ঘোর বিরোধী।’ পদত্যাগের মাধ্যমে নিজের প্রতিবাদও স্পষ্ট করলেন।

আসল গল্পটা শুরু হয় বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরই। স্পেন তখনো শিরোপার আনন্দে ভাসছে, ঠিক তখনই ফিফা ঘোষণা দেয়, বিশ্বকাপ পরিচালনার জন্য বিশ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার—যার নাম ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’। এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শেয়ার তুলে দেওয়া হবে বাইরের বিনিয়োগকারীদের হাতে। আর এই বিনিয়োগকারীর তালিকায় নাম আসে জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটালের। জশুয়া কুশনার সম্পর্কে ট্রাম্পের প্রাক্তন জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। রাজনীতি আর ফুটবল যেন একই বিন্দুতে মিশে গেল, আর তাতেই আগুনে ঘি পড়ল।

সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল উয়েফার কাছ থেকে। ফুটবলের আত্মা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে তারা এমন এক পদক্ষেপ নিল, যা ফুটবল ইতিহাসে বিরল। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহও পেরোয়নি, এমন সময়েই উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কটের পক্ষে ভোট দিল। এমন ঐক্য অতীতে কমই দেখা গেছে ফুটবল রাজনীতিতে। ফিফা অবশ্য মাথা নোয়ায়নি। পাল্টা জবাবে বলল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না, আর এমন চিন্তা তাদের কল্পনাতেও নেই।’

প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি, বিরোধিতা প্রকাশের অধিকার সবার থাকলেও একটি সংস্থা একাই ২১১ সদস্যের প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে পারে না। প্রত্যেক সদস্যকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়াই নাকি তাদের গণতান্ত্রিক নীতি। বিরোধিতার স্রোত থেমে থাকেনি ইউরোপেই। উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় ফুটবল সংস্থা (কনকাকাফ) প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যদিও বয়কটের পথে হাঁটেনি তারা। এএফসি সচরাচর ফিফার বিরুদ্ধে গলা তোলে না, এ সংস্থাও সবার আগে সরব হয়েছে।

ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মুনাফার লোভে খেলাটাকে পণ্য বানানোর চেষ্টা বারবার হয়েছে, আর প্রতিবারই তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২১ সালে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের পরিকল্পনা মাত্র কয়েকদিনেই ভেঙে পড়েছিল সমর্থক আর ক্লাবের প্রবল বিরোধিতায়। আবার ২০১৫ সালে ফিফার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার পর সেপ ব্লাটারকে বিদায় নিতে হয়েছিল অসম্মানের সঙ্গে। প্রতিবারই প্রমাণ হয়েছে, ফুটবল শুধু ব্যবসা নয়, এটা কোটি মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসার নাম।

এবারের লড়াইয়ে ফিফা কতদূর এগোতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু কর্ডেইরোর পদত্যাগপত্র যেন এক নীরব বার্তা দিয়ে গেল—ক্ষমতার একেবারে কাছের মানুষও যখন প্রশ্ন তোলেন, তখন বুঝতে হয় সংকট শুধু বাইরের নয়, ভেতরেও গভীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >