প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ে এখন যেন ফুটবলের ছন্দ। হলিউডের রুপালি আলোয় এবার মিশেছে সবুজ মাঠের উত্তেজনা। গ্ল্যামার ও স্বপ্নের শহর লস অ্যাঞ্জেলেস এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বকাপের উৎসবভূমিতে।
জুন মাসের শুরু থেকেই শহরটার চেহারা বদলে গেছে। সান্তা মনিকার সোনালি সৈকত থেকে ডাউনটাউনের আকাশছোঁয়া দালান সর্বত্র উড়ছে বিশ্বকাপের ৪৮টি দলের পতাকা। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ রঙের ব্যানারে ছেয়ে গেছে রাস্তার পর রাস্তা। যে শহর একসময় বাস্কেটবল আর বেসবলে মেতে থাকত, সে শহর এখন একটাই কথা বলছে ফুটবল।
১২ জুন। সোফি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ে। ফিফা যে স্টেডিয়ামকে ডাকছে ‘লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম’ নামে, সেই আসরে রচিত হতে যাচ্ছে আমেরিকান ফুটবলের নতুন ইতিহাস। আমেরিকানরা এতদিন যে খেলাটিকে ‘সকার’ বলে দূরে ঠেলে রাখত, সে খেলাই এখন তাদের হৃদয় জুড়িয়ে দিচ্ছে।
ম্যাচ শুরুর এক ঘণ্টা আগেই স্টেডিয়ামের আশপাশে ভিড় জমবে লাখো দর্শকের। কেটি পেরি, ব্ল্যাকপিংকের লিসা, র্যাপার ফিউচার, ব্রাজিলের আনিত্তা, নাইজেরিয়ার আফ্রোবিট তারকা রেমা এই বিশ্বতারকাদের কণ্ঠে সুর বাজবে উদ্বোধন মঞ্চে। ফুটবল কিংবদন্তি মিয়া হ্যামরাও থাকবেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণে। শুধু একটা ম্যাচ নয়, এটা একটা উৎসব পুরো লস অ্যাঞ্জেলেসের।
লস অ্যাঞ্জেলেস ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ হোস্ট কমিটি ঘোষণা দিয়েছে ১০টি অফিসিয়াল ফ্যান জোনের। টুর্নামেন্টের ৩৯টি দিন জুড়ে এই ফ্যান জোনগুলো পরিণত হবে আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে। শুধু স্টেডিয়ামের চার দেয়ালের মধ্যে নয়, পুরো শহরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে যাবে বিশ্বকাপের উত্তাপ।
শুরু হবে ১১ থেকে ১৪ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস মেমোরিয়াল কলোসিয়ামে অফিসিয়াল ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যাল দিয়ে। সেখান থেকে উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে ভেনিস বিচের ঢেউয়ে, হলিউডের পাবলিক পার্কে, আর এলএর বহুবর্ণ পাড়ায় পাড়ায়। বিচ ফ্রন্টে ওয়াচ পার্টি, পার্কে কমিউনিটি উৎসব, আইকনিক ল্যান্ডমার্কে থিমড ইভেন্ট প্রতিটি ফ্যান জোনের নিজস্ব রঙ, নিজস্ব সুর।
হোস্ট কমিটির প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন শ্লোয়েসম্যান বলেছেন, ‘আমরা গর্বিত যে, ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যাল এবং ১০টি ফ্যান জোনের মাধ্যমে পুরো লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে বিশ্বকাপের শক্তি ছড়িয়ে দিতে পারছি।’ সমুদ্রসৈকতের ওয়াচ পার্টি থেকে শুরু করে পার্কের পারিবারিক উৎসব সব বয়সের, সব সংস্কৃতির মানুষের জন্য জায়গা আছে এই মহোৎসবে।
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানাচ্ছে, এই বিশ্বকাপ থেকে শুধু এলএ কাউন্টিতেই ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হবে, যা ২০২২ সালের সুপার বোলের দ্বিগুণ। গোটা যুক্তরাষ্ট্রে ৭৮টি ম্যাচ থেকে অর্থনীতিতে যোগ হবে ৩০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ট্রাফিকের চিরচেনা জ্যাম এড়াতে এলএ মেট্রো নামিয়েছে বিশেষ এক্সপ্রেস বাস, শত শত শাটল ফুটবলপ্রেমীদের পৌঁছে দিতে ভেন্যুর দোরগোড়ায়।
এই শহরের বৈচিত্র্যই তার শক্তি। ব্রাজিলিয়ান পাড়া, মেক্সিকান পাড়া, কোরিয়ান পাড়া লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রতিটি কমিউনিটি নিজের দেশের দলকে সমর্থন করবে, আবার একসঙ্গে উৎসবে মাতবে। এটাই ফুটবলের জাদু এই খেলাটা মানুষকে ভেদাভেদ ভুলিয়ে এক করে দেয়।
রেফারির বাঁশি যখন বাজবে সোফি স্টেডিয়ামে, সেই মুহূর্তে শুধু ৭০ হাজার দর্শক নয় পুরো লস অ্যাঞ্জেলেস শহর, লাখ লাখ মানুষ একজোট হয়ে শ্বাস ধরে রাখবে। হলিউডের স্বপ্নের শহর সেদিন হয়ে উঠবে ফুটবলের স্বপ্নের শহর।







