ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নথিপত্র না থাকা অন্তত ৩৮৬ জনকে আটক করে আটটি সীমান্ত জেলার ১৩টি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ‘আটক শিবিরে’ পাঠানো হয়েছে।
আটকদের বাংলাদেশি দাবি করে হিন্দুস্তান টাইমস শুক্রবার এক খবরে বলেছে, তাদের অচিরেই বাংলাদেশে পাঠানো হবে। তার আগে এই ৩৮৬ জনকে ‘আটক শিবিরেই’ রাখা হবে বলে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এক পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ৩৩৫ জন ‘অভিবাসীকে’ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা বসিরহাটের তিনটি কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৯ জন নারী এবং ৯৫ জন শিশু। এছাড়া মুর্শিদাবাদে ১৯ জন, মালদায় ৯ জন এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় নথিপত্র না থাকা ৮ জনকে রাখা হয়েছে।
মে মাসের শুরুতে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরপরই ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকরের ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কাউকে বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহ হলেই সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
পাশাপাশি ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ ফেরত পাঠানোর আগে রাখার জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলায় ‘আটক শিবির’ গড়ে তোলা হয়।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে এরইমধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, এরইমধ্যে বেশ কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় রাজ্য ছাড়তে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তগুলোতে জড়ো হয়েছেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, যারা ভারতে অবৈধপথে এসেছিলেন, তারা যদি ‘স্বেচ্ছায়’ ফিরে যেতে চান, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হবে না। তবে ওই ঘোষণার আগেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য অনেক মানুষ প্রতিদিন হাজির হচ্ছেন সাতক্ষীরা আর পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চলে।
রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, উত্তর ২৪ পরগনার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে হাকিমপুরে বিএসএফ চেকপোস্টের কাছে কয়েক ডজন নথিপত্র না থাকা ‘অভিবাসী’ বাংলাদেশে ফিরে যেতে জড়ো হয়েছেন। তাদের সবাইকে বসিরহাটের ‘আটক শিবিরগুলোতে’ পাঠানো হয়েছে বলে তথ্য দেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।
গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে নথিপত্র না থাকা ‘বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ যত দ্রুত সম্ভব রাজ্য ছাড়ার হুঁশিয়ারি দেন। অন্যথায় সরকার ‘যা করার তা-ই করবে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “তারা কি আমাদের জামাই যে এই দেশ (ভারত) তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও ওষুধের খরচ জোগাবে?”
এরইমধ্যে সরকারের নির্দেশে রাজ্যের জেলাগুলোতে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, মোটেল এবং কমিউনিটি হলসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনকে ‘আটক শিবির’ হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে নথিপত্র না থাকা ‘অভিবাসীদের’ রাখা হচ্ছে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গে সিএএ শুরু হওয়ার পর নথিপত্র না থাকা হাজার হাজার ‘অভিবাসী’ বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য হাকিমপুরে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এক দশকের বেশি সময় ধরে কলকাতা এবং আশপাশের অঞ্চল ও রাজ্যের অন্যান্য অংশে বসবাস করছিলেন।
সে সময় যারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের অধিকাংশেরই আধার কার্ডসহ ভারতীয় নথিপত্র ছিল এবং তারা গৃহকর্মী, অটোরিকশা চালক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, “নথিপত্র না থাকা অভিবাসীদের প্রথম ঢেউটি ছিল অনেক বড়। তখন হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে গত মঙ্গলবার থেকে। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে বিএসএফ চেকপোস্টের বাইরে মাত্র ১০০ জনের মত বাংলাদেশি জড়ো হওয়ার খবর রয়েছে।”
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে; এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে সবচেয়ে দীর্ঘ অংশ, প্রায় ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার। এই অংশের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, যার ফলে এই সীমান্ত এলাকাটি বেশ উন্মুক্ত এবং পাচার ও চোরাচালানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বেড়াবিহীন অংশগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া দিতে সম্প্রতি রাজ্যের নতুন সরকার বিএসএফের কাছে প্রায় ১৪২ একর জমি হস্তান্তর করেছে।
এছাড়া গত এক বছর ধরে নথিপত্র না থাকা বহু মানুষকে বাংলাদেশি সন্দেহে ‘পুশ ব্যাক’ করেছে ভারত।







