সিলেট টেস্টের প্রথম দিনটা যেন ছিল দুই ভিন্ন গল্পের মিশেল। সকালের মেঘলা আকাশে পাকিস্তানি পেসারদের তোপে একসময় ধুঁকছিল বাংলাদেশ। স্কোরবোর্ডে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ছিল স্বাগতিকরা। তবে সেখান থেকেই একাই ম্যাচের রং বদলে দেন লিটন দাস। দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল আর চোখধাঁধানো এক ইনিংসে তুলে নেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। তার ১২৬ রানের লড়াকু ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ২৭৮ রান। দিন শেষে পাকিস্তান জবাব দিতে নেমে কোনো উইকেট না হারিয়ে করেছে ২১ রান। স্কোরকার্ডের গল্প বলছে লিটনের অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের দিনটা বাংলাদেশের।
সকালের প্রথম ঘণ্টাতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই মুহাম্মদ আব্বাসের শিকার হন মাহমুদুল হাসান। এলবিডব্লুর আবেদন থেকে বাঁচলেও পরের বলেই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে শূন্য রানে ফেরেন তিনি। এরপর টেস্ট অভিষেক হওয়া তানজিদ হাসান ও মুমিনুল হক কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন।
তানজিদ আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন শট খেলেন। তবে ভালো খেলেও নিজের ভুলে উইকেট ছুড়ে দেন তিনি। খুররম শাহজাদের শর্ট বল মিড-অন দিয়ে তুলে মারতে গিয়ে সহজ ক্যাচ দেন বোলারের হাতেই। ৩৪ বলে ২৬ রান করে ফেরেন তরুণ ওপেনার। মুমিনুলও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। শাহজাদের ভেতরে ঢোকা দারুণ এক ডেলিভারিতে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে বোল্ড হন তিনি। ৪১ বলে করেন ২২ রান।
তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশকে কিছুটা স্থিরতা এনে দেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম। দুজন মিলে চতুর্থ উইকেটে ৩৮ রানের জুটি গড়েন। তবে লাঞ্চের পর পাকিস্তান আবারও ম্যাচে ফিরে আসে। প্রথমে আব্বাসের শিকার হন নাজমুল। ২৯ রান করে ফিরেন অধিনায়ক।
এরপর খুররম শাহজাদের ইনসুইং ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হন মুশফিকুর রহিম। ২৩ রানের বেশি এগোতে পারেননি তিনি। মেহেদী হাসান মিরাজও টিকতে পারেননি। মাত্র ৪ রান করে বাউন্সারে ক্যাচ দেন তিনি। ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে তখন বড় বিপদে বাংলাদেশ।
সেখান থেকেই শুরু লিটন দাসের একক লড়াই। উইকেটে এসে শুরুতে সময় নিয়েছেন, চোখ সেট করেছেন। তারপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন পুরো ইনিংসের। লোয়ার অর্ডারের ব্যাটারদের সঙ্গে অসাধারণ বোঝাপড়ায় ইনিংস গড়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। কখনো তাইজুল ইসলামকে স্ট্রাইক থেকে দূরে রেখেছেন, কখনো তাসকিন বা শরিফুলকে সাহস জুগিয়েছেন। পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে বেছে বেছে খেলেছেন আক্রমণাত্মক শট।
তাইজুলকে সঙ্গে নিয়ে গড়েন ৫২ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। তাইজুল ১৬ রান করে আউট হলেও লিটন থামেননি। এরপর তাসকিন ও শরিফুলকে নিয়েও ইনিংস টেনে নিয়ে যান। চাপের মুখে টেস্ট ক্যারিয়ারের ২০তম ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। পরে সেটিকে রূপ দেন ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে এটি তার তৃতীয় শতক। যখন বাংলাদেশ ৪ উইকেটে ১০৬ রানে ছিল, তখন উইকেটে এসেছিলেন লিটন। সেখান থেকে একপ্রান্ত আগলে রেখে দলকে নিয়ে যান ২৮০ রানের কাছাকাছি।
লিটনের ইনিংসের মাঝেই পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একবার খুররম শাহজাদের বাউন্সারে লিটনের গ্লাভসে লেগে বল উইকেটকিপার মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে গেলেও রিভিউ নেননি তিনি। রিপ্লেতে দেখা যায় পরিষ্কার এজ ছিল। এর আগে মুশফিকের ক্ষেত্রেও একই ভুল করে পাকিস্তান। সাজিদের বলে গ্লাভসে লাগা বল ক্যাচ হলেও রিভিউ নেয়নি দলটি। দুই ক্ষেত্রেই পাকিস্তান সুযোগ হারায়।
দিনের শেষদিকে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন লিটন। শরিফুলকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রান তোলেন। তবে ১২৬ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে শেষ পর্যন্ত হাসান আলীর বলে আউট হন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর প্রয়োজনমতো আক্রমণ। লিটনের বিদায়ের তিন বল পর নাহিদ রানাও আউট হলে ৭৭ ওভারে ২৭৮ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।
দিনের বাকি সময়ে পাকিস্তান ৬ ওভার ব্যাট করার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের বোলাররা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল। তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম নতুন বলে চেষ্টা চালান। পরে মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাহিদ রানাও আক্রমণে আসেন। তবে কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান তুলে দিন শেষ করে পাকিস্তান। প্রথম দিনের শেষে ম্যাচ এখনো পুরোপুরি খোলা। তবে সকালের বিপর্যয় থেকে লিটনের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে কিছুটা স্বস্তি নিয়েই মাঠ ছেড়েছে।
তথ্যসূত্রঃ আমার দেশ







