নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অফিসটির সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল ইমাম এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টিটু, মারুফ ও মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেবা ও কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও বিভিন্ন অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গেলেও অনেক সময় সহজে কাজ সম্পন্ন করা যায় না। প্রথমে কাগজপত্রে ত্রুটি, নিয়মের জটিলতা কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যার কথা বলা হয়। পরে অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর টিটু ও মারুফের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
‘ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না’—সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ
অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক ব্যক্তির দাবি, এখানে নিয়মিত কাজ করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপ অনুভব করতে হয়। কেউ নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি না হলে তার কাজ বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। জমি-জমার কাগজপত্রের কাজ বুঝি না। অফিসে গেলে একেকজন একেক কথা বলেন। পরে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তাদের সঙ্গে কথা বললে টাকা ছাড়া কাজ হবে না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।”
আরেক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরও নানা ধরনের অজুহাত দেখিয়ে তাকে ঘুরানো হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে হলে ‘মাধ্যম’ নির্ভরতার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় টিটু ও মারুফের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। তাদের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে কোনো কাজ নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেবাগ্রহীতাদের নিজেদের কাছে পাঠিয়ে দেন। এরপর তারা বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। জমি রেজিস্ট্রি কিংবা দলিল-সংক্রান্ত কাজের জন্য অফিসে আসা অনেকেই নিয়মকানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আর সেই সুযোগেই অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
টিটু ও মারুফের বক্তব্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন
অভিযোগের বিষয়ে টিটু ও মারুফের সঙ্গে কথা বললে তারা এমন বক্তব্য দেন, যা নিয়ে আরও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রার পদে আসতে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। পাশাপাশি অফিসে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন আসেন এবং তাদেরও বিভিন্নভাবে ‘দিতে হয়’—এমন কথাও তারা বলেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ না নিলে অন্যদের দেওয়ার অর্থের ব্যবস্থা করা কঠিন। তবে তাদের এ বক্তব্যের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তারা যে অর্থ লেনদেনের কথা বলেছেন, তার সুনির্দিষ্ট উৎস বা পরিমাণও জানা যায়নি।
এ ধরনের বক্তব্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সরকারি সেবা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অনিয়ম ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
জমি রেজিস্ট্রি করতে এসে বিপাকে সাধারণ মানুষ
সিদ্ধিরগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার মানুষ জমি ক্রয়-বিক্রয়, দলিল রেজিস্ট্রেশন, নামজারি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আসেন। এসব কাজের সঙ্গে মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও অর্থ জড়িত থাকায় তারা দ্রুত এবং নিয়ম অনুযায়ী সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা করেন।
কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, অফিসে এসে অনেকেই প্রত্যাশিত সেবা পাওয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে যারা প্রথমবার জমি রেজিস্ট্রির কাজে আসেন, তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি ও অন্যান্য খরচের হিসাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় তারা অনেক সময় অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলেও কাজ আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত চুপ থাকতে হয় বলে অভিযোগ করেন।
তদন্তের দাবি সচেতন মহলের
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, কোনো সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নির্ধারিত ফি ও সেবার নিয়মাবলি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা হলে সাধারণ মানুষের হয়রানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে অর্থ দাবি করে থাকেন, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সিদ্ধিরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ এবং টিটু, মারুফ ও মনিরুজ্জামানের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন
সিদ্ধিরগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল ইমামের বক্তব্য জানা জরুরি। একই সঙ্গে টিটু, মারুফ ও মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করাও প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই সাপেক্ষে প্রকৃত ঘটনা আরও পরিষ্কার হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।





