নারায়ণগঞ্জ । রবিবার
৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
২৫শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্ট্যান্ডবাজি নয়, কিং মেকারের ক্যারিশমাটিক সিদ্ধান্ত

হাতি মার্কায় বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) থেকে মনোনয়ন জমা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আবারও নিজের ক্যারিশমা প্রমাণ করলেন ‘কিং মেকার’ খ্যাত সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ধানের শীষের দীর্ঘদিনের সমর্থক মোহাম্মদ আলী বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে জোটগত সমীকরণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ওই আসনটি ছেড়ে দিয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে জোট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এ অবস্থায় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামবেন।

কিন্তু বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, যে আসনগুলোতে জোট প্রার্থী রয়েছে, সেখানে বিএনপির কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারবেন না। এই ঘোষণার পর যেখানে অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, সেখানে মোহাম্মদ আলী নিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। দলীয় এই সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়ে মোহাম্মদ আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ থেকে সরে এসে ভিন্ন এক কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এমন সিদ্ধান্ত ঠিক যেনো রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রজ্ঞার বিরল দৃষ্টান্ত।

২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি) গত ২৩ অক্টোবর ‘হাতি’ প্রতীকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে। দলের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মুরুব্বি মোহাম্মদ আলী। সেই দল থেকেই তিনি ২৯ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি ১৯৯৬ সালে বিএনপির এমপি ছিলাম। বেগম খালেদা জিয়া আমাকে ডেকে নিয়ে এমপি বানিয়েছিলেন। আমি ধানের শীষের পক্ষে ছিলাম, আছি এবং থাকবো। ধানের শীষের পক্ষ থেকেই আমি জনগণের জন্য কাজ করেছি, আগামীতেও জনগণের জন্যই কাজ করে যাবো।

এই বক্তব্যে পরিষ্কার—দল বদল নয়, অবস্থান বদল নয়, বরং নীতিগত দৃঢ়তাই তার রাজনৈতিক পরিচয়। রিপাবলিকান পার্টির হয়ে নির্বাচন করলেও বিএনপির প্রতি তার এই প্রকাশ্য শ্রদ্ধা ও আনুগত্যকে কেউ কেউ ‘স্ট্যান্ডবাজি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ব্যাখ্যা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

এদিকে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু অভিযোগ করেছেন, নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ইন্ধনেই মোহাম্মদ আলী নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। টিপুর এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকান পার্টির নেতাকর্মীরা।

টিপুর এই বক্তব্যকে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরাসরি হাস্যকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির নেতাকর্মীরা। পার্টির এক নেতা বলেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে গিরগিটি তকমা পাওয়া টিপু নিজেই সময়ে-অসময়ে অবস্থান বদলেছেন। অর্থ ও ক্ষমতার লোভে তিনি কখনো এ দলে, কখনো ও দলে ভিড়েছেন। তার অভিযোগের কোনো রাজনৈতিক মূল্য নেই।

তিনি আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জের ফ্যাসিবাদের সমর্থক,যাকে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী ব্যানারে থাকতে দেখা গেছে এবং নানা সময়ে বির্তকের তুঙ্গে থাকা নেতা মাসুদুজ্জামানের নির্বাচনী সঙ্গী হয়েছিলেন যেই টিপু তার মুখে এমন অভিযোগ হাস্যকর। টিপুর মন্তব্যকে নারায়ণগঞ্জবাসি এখন তোয়াক্কা করে না। কেননা, টিপু একাধারে কখনো ব্যাঙের মুখে চুমু খাচ্ছেন তো ঠিক পরক্ষণেই সাপের ঠোঁটে চুমু দিয়ে বিশ্রী হাসি হেসেছেন। এমন রাজনীতিকের কথায় মানুষ এখন আর বিভ্রান্ত হয় না।

একই আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম। তবে জোটের সিদ্ধান্ত তারা মেনে না নিয়ে দলের কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন। ফলস্বরূপ বিএনপি তাদের দু’জনকেই দল থেকে বহিষ্কার করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে পার্থক্য। কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত ভেঙে ব্যক্তিস্বার্থে মাঠে নামেন, আর কেউ দলকে সম্মান জানিয়ে নিজের দল থেকেই নির্বাচনে যান। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে ধানের শীষের প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র রাজনীতিবিদরা বলছেন, ধানের শীষের প্রত্যাশা রাখা কোনো বিএনপি নেতার জন্য কখনোই স্ট্যান্ডবাজি হতে পারে না।

বিগত বেশ কয়েক দশক ধরে এই ফতুল্লাকে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক নানা গতিপথ। পর্দার এপিঠ-কিংবা ওপিঠ; উভয় ক্ষেত্রেই রাজনীতি এবং ভোটের মাঠের এই গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভূমিকা রেখে চলেছেন ‘ঝানু’ রাজনীতিবীদ হিসেবে পরিচিত বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। যিনি তার নিজস্ব ক্যারিশমায় অর্জন করেছেন ‘কিং মেকার’ খেতাব।

রাজনীতির জটিল খেলায় তিনি যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি! রাজনৈতিক মহলে বরাবরই মোহাম্মদ আলী পরিচিত এমন একজন নেতা হিসেবে, যিনি প্রার্থী ঠিক করেন, জয়ের সমীকরণ গড়েন এবং প্রয়োজন হলে পুরো দৃশ্যপট উল্টে দেন। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ‘কিং মেকার’ নিজেই প্রার্থী হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের নির্বাচনী সমীকরণ নতুন করে হিসাব-নিকাশের মুখে পড়েছে। এতেই কিছু কিছু নেতাদের পাকা ধানে মই পরেছে বলে মনে করছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ধানের শীষের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেও দলীয় শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নিজ দলের ব্যানারে নির্বাচনে যাওয়া কোনো স্ট্যান্ডবাজি নয়। বরং এটিই প্রমাণ করে একজন রাজনীতিক কতটা দূরদর্শী, কৌশলী ও দায়িত্বশীল হতে পারেন। এখানেই নিহিত রয়েছে ‘কিং মেকার’ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ক্যারিশমা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >