নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পঞ্চবটিতে আজ যেখানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন যমুনা অয়েল ডিপো, একাত্তরে সেখানেই নেমে এসেছিল বিভীষিকার অন্ধকার। তৎকালীন ন্যাশনাল অয়েল মিল নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী জানান, এই মিলের জেটিতে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। নির্যাতনের পর হত্যা করে হাত-পা বেঁধে অসংখ্য মানুষকে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সে সময় নদীতে পচে ফুলে ওঠা অসংখ্য লাশ ভেসে উঠত, যা এলাকাবাসীর স্মৃতিতে আজও শিউরে ওঠার মতো।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মিল চত্বরে অবস্থিত একটি টিন কারখানার ভেতরে নারীদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মিলের ভেতর থেকে নারীদের নির্যাতনের একাধিক ভয়াবহ আলামত উদ্ধার হয়। একাত্তরে এই ন্যাশনাল অয়েল মিলটির মালিক ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ছেলে গহর আইয়ুব—যা ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়কে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আজও সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মারক হিসেবে মিলটির এক পাশে ‘বধ্যভূমি’ লেখা একটি সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেখানে ঠিক কত মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান আজও নেই। নাম না জানা অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেছে নীরব আর্তনাদ হয়ে।

এই প্রেক্ষাপটে আজ সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নাম না জানা শহীদদের স্মরণে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) রায়হান কবির, জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি, এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ—নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে জেলার মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এসময়ে আরো ফুলেল শুভেচ্ছা দেন, আসাদুজ্জামান নূর এসিল্যান্ড নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূর ,তারিকুল ইসলাম এনডিসি জেলা প্রশাসক কার্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সদস্য সচিব নুর আলম, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এনায়েত নগর এর আহবায়ক মোঃ সামসুল হক।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে তারা আবারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, ফতুল্লার এই বধ্যভূমির ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান।
নীরব যমুনা অয়েল ডিপো আজও দাঁড়িয়ে আছে—একটি স্থাপনা নয়, বরং একাত্তরের অবর্ণনীয় নির্যাতন আর আত্মত্যাগের জীবন্ত দলিল হয়ে।




