১৯৭১ এ যুদ্ধ চলাকালীন পুরো নয় মাস নিরীহ মানুষের উপর পাক হানাদার বাহিনী বর্বরোচিত নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও রয়ে গেছে তাদের সে নির্যাতন ও বর্বরতার অসংখ্য চিহ্ন। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত হয়েছে ১০৯টি গণহত্যা, রয়েছে ৩৩টি বধ্যভূমি ও গণকবর,একই সাথে রয়েছে ৪৬টি নির্যাতনকেন্দ্র। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরপরাধ নিরীহ মানুষদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ও গৌরবের সে উপাখ্যান এখনো পুরোপুরি সংগ্রহ করা যায় নি, নেই কোন শহীদের তালিকা।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) ১৯৩ জন শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ড এর উদ্যোগে বক্তাবলী কানাইনগর ছোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক এবং বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। স্মরণ সভায় যোগদানের পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী শহীদদের স্মরণে স্মৃতি স্তম্বে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এ সময় তার সাথে বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একই সাথে শোক ও গৌরবের দিন। দিনটি বক্তাবলী গণহত্যা ও প্রতিরোধের দিবস হিসেবে পরিচিত।
নারায়ণগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলে ধলেশ্বরী নদীর পাড় ধরে বক্তাবলীর বাইশটি গ্রাম। বক্তাবলী ও আলীরটেক দুটি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত বক্তাবলী পরগনা। ২৯ নভেম্বর রাতে যখন ঘন কুয়াশার চাদরে ছেয়ে আছে বক্তাবলী পরগনা;ঠিক তখনই নারায়ণগঞ্জ শহরের কয়েকজন রাজাকারের সহযোগিতায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে পাকবাহিনী তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে গোটা বক্তাবলী পরগনাকে । যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু করেন।

পাকবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা বাধ্য হয়ে পিছু হটেন। তখনই তারা ডিক্রির চর নদীর পাড়ে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে একসাথে হত্যা করে চল্লিশ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। লক্ষ্মীনগর কবরস্থানের কাছে খড়ের পাড়ার ভেতরে আশ্রয় নেয়া দলবদ্ধ গ্রামবাসীদের আগুন দিয়ে পুরিয়ে হত্যা করে। শীতের সকালে রাজাপুরের হলুদ সরিষা ক্ষেত লাল হয়ে ওঠে, পড়ে থাকে লাশের পর লাশ। সে দিন বক্তাবলীতে ১৩৯ জনকে হত্যা করে পাক হানাদারবাহিনী। বক্তাবলী পরগনার বাইশটি গ্রামই গানপাউডার দিয়ে বিকেলের মধ্যেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
দেশে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে যে কয়টি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বক্তাবলী তাদের মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রতিরোধ হয়েছে, পাকসেনাদের হত্যা করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। অথচ নির্মম আমাদের বাস্তবতা! ৫৪ বছর পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ছাত্রদের তালিকায় যেমনি এ বক্তাবলীর কৃতি শিক্ষার্থী শহীদদের নাম নেই, তেমনি স্থানীয় জেলা প্রশাসনের শহীদদের তালিকাতেও নেই বক্তাবলীতে নির্মম ভাবে গনহত্যায় শহীদ হওয়া ১৩৯ জনের নাম।




