নারায়ণগঞ্জ । শনিবার
১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

টিপুর মন্তব্য যেনো
বাঘের সাম্রাজ্যে বিড়ালের “ম্যাও”

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে অভূতপূর্ব ঝড়। মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভায় হঠাৎই বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ বক্তব্য ছুড়ে দিলে মুহূর্তেই সারা রাজনৈতিক অঙ্গন রীতিমতো উত্তাল হয়ে ওঠে।

সভায় উপস্থিত নেতাদের ভাষ্যমতে, টিপুর এমন বিস্ফোরক মন্তব্যে একজন নেতাও সাড়া দেননি, সমর্থন তো দূরের কথা। ফলে টিপুর এমন অযৌক্তিক দাবি সভাকক্ষেই কার্যত ‘একক নাটক’ হয়ে পড়ে এবং যা পরবর্তী সময়ে বিষয়টিকে আরও ঘনঘোর রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ দিয়েছে।

মতবিনিময় সভায় টিপু বলেছিলেন, মোহাম্মদ আলী মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করছেন। বক্তাবলীতে প্রোগ্রাম করে বলেছে সে নির্বাচন করবে ওকে গ্রেপ্তার করা হোক। সর্বত্র বয়কট করা হোক। আপনারা না করলে আমরা বয়কট করবো। ফ্যাসিস্টের দোসরকে প্রশ্রয় দিলে আন্দোলনের আত্মত্যাগ অপমানিত হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে তাকে বাদ দিতে হবে।

টিপুর এমন অযৌক্তিক বক্তব্যে যেন ব্যক্তিগত আক্রোশের গন্ধ মিলেছে এমনটা উল্লেখ করে বিভিন্ন নেতারা বলেছেন, টিপুর এমন ভাষা ও ভঙ্গি বহু নেতার কাছে অযাচিত, আক্রমণাত্মক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। টিপুর এমন প্রকাশ্য উদ্ভট মন্তব্য বিএনপির ভেতরে নতুন করে অসন্তোষ ও বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ব্যক্তি, সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে এমন মন্তব্যকে তারা অযৌক্তিক ও অপরিণত রাজনৈতিক আচরণ মনে করছেন। মোহাম্মদ আলীর মতো প্রভাবশালী নেতা, যাকে নারায়ণগঞ্জে অনেকে ‘কিং মেকার’ বলে থাকেন, তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য দলকে শুধু অস্থিতিশীলই নয়, হাস্যকর অবস্থাতেও ফেলেছে।

তাদের ভাষায়, “যে মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে বড় বড় নেতাদের উত্থান হয়েছে সেই ‘কিং মেকার’কে নিয়ে টিপুর এমন অবাস্তব মন্তব্য যেন বাঘের সাম্রাজ্যে বিড়ালের ‘ম্যাও’ ডাকের মতোই হাস্যকর।”

বিএনপি অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, দলীয় আন্দোলন-সংগ্রাম, সিদ্ধান্ত এবং অবস্থানে পূর্বে বহুবার বিভিন্নমুখী অবস্থান নেওয়ায় টিপু নিজেই ছিলেন বারবার সমালোচনার মুখে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সবাই জানে টিপুর অবস্থান কখনোই স্থির ছিল না।কয়েকজন বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেন, টিপু কখনো কঠোর অবস্থানে, কখনো নরম সমর্থনে, আবার কখনো বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে রাজনৈতিক নৈকট্য তৈরি করে নিজেকে এক অনির্দিষ্ট রাজনৈতিক রেখায় দাঁড় করিয়েছেন। একসময় এক কথা, অন্যসময় আরেক কথা ঠিক যেনো গিরগিটির মতো রঙ বদলানোই তার পরিচিতি। দলকে ধ্বংসের দরজায় দাড় করিয়ে টিপু নিজের অবস্থান বিক্রি করেছেন কার কাছে সেটা সবাই জানে।

টিপুর অদ্ভুত বক্তব্যের পর বিএনপির ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর গোপন নয়। অনেক নেতাই সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, “এমন বিভাজন সৃষ্টিকারী, অস্থিরচরিত্র রাজনৈতিক নেতার হাতে মহানগর বিএনপির দায়িত্ব কীভাবে নিরাপদ? সময়-অসময়ে নিজের অবস্থান পাল্টানো রাজনীতিবিদ দিয়ে দল চলতে পারে না। এ ধরনের ঘোলাটে ভূমিকা দলের শীর্ষ পদে থাকার জন্য কতটা উপযোগী সেই প্রশ্ন এখন সার্বজনীন।”

নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভেতর এখন স্পষ্ট দুই মেরু। একদিকে মোহাম্মদ আলীকে ঘিরে তৃণমূলের ভালোবাসা ও আস্থা, অন্যদিকে টিপুর হঠাৎ আক্রমণাত্মক অবস্থান সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভেতরে নতুন বিভাজন ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানাচ্ছেন দলীয় অনেক নেতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের মন্তব্য শুধু দলের ভেতরেই নয়, আগামী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটেও বিএনপিকে অপ্রস্তুত ও দুর্বল অবস্থানে ফেলে দিতে পারে। টিপুর এমন অযাচিত মন্তব্য শুধুই রাজনৈতিক ভুল নয়, বরং দলের ভেতর থেকেই বিএনপিকে দুর্বল করে দেওয়ার এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >