নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: নারায়ণগঞ্জে বিএনপির মহিলা দলের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মহানগর মহিলা দলের নেত্রী দিলারা মাসুদ ময়না, বিবাহ হাসান ও দিনা আক্তারসহ কয়েকজন নেত্রীকে ঘিরে বিভিন্ন ছবি, স্ট্যাটাস, মন্তব্য ও কমেন্টকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এতে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তাদের ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় তোলা ছবি সামনে এনে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। পাল্টা অবস্থানে অন্য পক্ষও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য করছেন। ফলে বিষয়টি এখন আর ব্যক্তিগত বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিএনপির মহিলা দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
এদিকে সংশ্লিষ্ট নেত্রীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতে তারা যখন বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তখন দায়িত্ব পালনের স্বার্থে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে হয়েছে।

তাদের দাবি, শামীম ওসমান তৎকালীন সময়ে একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ছিলেন এবং সেলিনা হায়াৎ আইভী ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র। ফলে ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জনগণের বিভিন্ন সমস্যা ও উন্নয়নমূলক কাজের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করতে হতো। সেই সূত্রেই অনেক ছবি তোলা হয়েছে।
তাদের বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধির সঙ্গে ছবি থাকা মানেই তার রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সমর্থন কিংবা দলীয় অবস্থানের সঙ্গে আপস করা নয়। জনগণের স্বার্থে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা আর রাজনৈতিকভাবে তাদের পক্ষে কাজ করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতের ছবি দেখিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও তারা প্রশ্ন তুলছেন।

অন্যদিকে বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন—যদি অতীতের ছবি তোলা কেবল দায়িত্ব পালনের অংশ হয়ে থাকে, তাহলে একই যুক্তি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হবে কি? তারা মনে করছেন, একজনের পুরোনো ছবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অন্যজনের একই ধরনের ছবি আড়াল করার চেষ্টা করলে দলের ভেতরে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্ট বক্সে ইতোমধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের একেক পক্ষ একেক নেত্রীর পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। কেউ দিলারা মাসুদ ময়নার পক্ষে, আবার কেউ বিবাহ হাসান কিংবা দিনা আক্তারের অবস্থানকে সমর্থন করে মন্তব্য করছেন। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও মন্তব্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে অতীতের ছবি থাকাকে কেন্দ্র করে এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে আক্রমণ করা হলে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, কারও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়, বরং দলীয় ফোরামে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এলাকায় বিএনপির মহিলা দলের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসা দলটির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি অবস্থান ভবিষ্যতে সাংগঠনিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ব্যক্তিগত ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে বিরোধ না বাড়িয়ে দলীয়ভাবে বিষয়গুলোর সমাধান করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক ছবি, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির মহিলা দলের অভ্যন্তরে যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছে, তা এখন দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে প্রকাশ এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হবে।




