নারায়ণগঞ্জ ।
,

নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল ফতুল্লায় ২৫ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় একটি গাড়ী

নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ফতুল্লা। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, অসংখ্য কলকারখানা, ব্যস্ত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর নিয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি,পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফতুল্লা থানা এলাকায় বসবাস করা প্রায় ২৫ লাখ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তীব্র যানবাহন সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। সচল গাড়ির স্বল্পতা ও পুরনো যানবাহনের বেহাল দশায় ব্যাহত হচ্ছে টহল, অভিযান ও আসামি গ্রেপ্তারের কার্যক্রম।


বাংলায় একটি প্রবাদ আছে আগে পেট, তার পিঠ’। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ যানবাহন সংকটে ফতুল্লা মডেল থানার কার্যক্রমই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব হলেও প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে সেই সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


থানা পুলিশের সচল গাড়ী রয়েছে সর্বমোটে দুটি। এ দুটির একটি অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ব্যবহার করে। যা অধিকাংশ সময়ই ভিআইপিদের ডিউটিতে নিয়ে যাওয়া হয়।।অপরটিকে সচল বললে ভুল হবে। কোনমতে লক্কর-জক্কর ভাবে চলছে। কোন কোন সময় পথিমধ্যে বিকল হয়ে পরলে তা মিস্ত্রি এনে সারিয়ে নিতে হয় বা ধাক্কা দিয়ে গাড়ীর গ্যারেজ কিংবা থানায় নিয়ে আসতে হয়।আরেকটি পিকআপ রয়েছে যা আসামীদের আনা নেয়ার কাজে

ব্যবহৃত হয়। তাই বলা যায় ২৫ লাখ লোকের নিরাপত্তা বা সেবা প্রদানে থানা পুলিশের রয়েছে মাত্র একটি গাড়ী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, থানাটিতে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি যানবাহন কম। যে কয়েকটি গাড়ি রয়েছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি পুরনো ও জরাজীর্ণ। মেরামতের পরও বারবার বিকল হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিয়মিত টহল থেকে শুরু করে জরুরি অভিযান পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টহলকাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ির গতি অত্যন্ত সীমিত। গাড়িটির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারও হয় কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থায় দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের ধাওয়া করা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।


ফতুল্লা থানার আওতাধীন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও অলিগলিতে নিয়মিত টহল প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত সচল সরকারি যানবাহন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রিকুইজিশন করা প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


এ ধরনের যানবাহন ব্যবহারে সময়মতো গাড়ি পাওয়া, চালকের অনীহা, ভাড়া নিয়ে জটিলতা এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা নিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে হয় পুলিশ সদস্যদের। বিশেষ করে জরুরি অভিযান ও আসামি পরিবহনের ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, অভিযানে যাওয়ার আগে অনেক সময় যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হয়। কখনো সিএনজি পাওয়া যায়, আবার কখনো পাওয়া যায় না। এতে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয় এবং অপরাধীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।


ফতুল্লা থানা এলাকাকে বলা হয়ে থাকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ভর শ্রমিক অধুষ্যিত এলাকা। শিল্পকারখানা ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ হওয়ায় এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পুলিশি সাড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কারণে টহল কার্যক্রম ব্যাহত হলে অপরাধ প্রতিরোধ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কোনো ঘটনা ঘটার পর পুলিশ দ্রুত পৌঁছাতে না পারলে অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাই জনসংখ্যা, শিল্পকারখানার ঘনত্ব এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন বিবেচনায় থানাটিতে পর্যাপ্ত ও কার্যকর যানবাহন নিশ্চিত করা জরুরি।


ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, তাদের থানায় সরকারি গাড়ী রয়েছে মাত্র দুটি। আর বিকেএমই থেকে পাওয়া একটি ছোট পিকআপ গাড়ী। দুটি গাড়ীর মধ্যে একটি হচ্ছে থানার অফিসার ইনচার্জের জন্য যা অধিকাংশ সময়ই ভিআইপি ডিউটিতে নিয়োজিত থাকে। আরেকটি প্রায় বিকল থাকে। ঠিক ঠাক করে কয়েকদিন চলার পর আবারো বিকল হয়ে যায়। বলা চলে রাস্তায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পরেছে। তবুও এটা দিয়েই চলতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। আর বিকেএমই থেকে পাওয়া গাড়িটি আসামী আনা নেওয়া করা হয়।


যানবাহন সংকটের বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান(পিপিএম) জানান, এ সমস্যা শুধু ফতুল্লা থানার নয়, সারা দেশের পুলিশেরই একটি বড় সংকট। যানবাহনের চাহিদা ও বরাদ্দের বিষয়টি জেলা পুলিশ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না; এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে নতুন যানবাহনের জন্য সংশ্লিষ্ট মহল কে অবগত করেছি। আশা করছি, দ্রুতই এর সমাধান পাওয়া যাবে।”
সচেতন মহলের মতে, ফতুল্লা মডেল থানার যানবাহন সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অচল ও জরাজীর্ণ গাড়ি মেরামতের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন যানবাহন বরাদ্দ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং টহল সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা জরুরি।


শিল্পাঞ্চল ও বিপুল জনসংখ্যার এই এলাকায় মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের গতিশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অপরাধ দমন, জরুরি সাড়া প্রদান ও নিয়মিত টহল কার্যক্রমে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >