নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় স্থানীয়দের উদ্যোগে এলাকাকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে গঠিত আলীগঞ্জ পঞ্চায়েত কমিটি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আগামী শনিবার কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাইমা ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) তারেক আল মেহেদী এবং ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাহবুব আলমের।
তবে এই কমিটির সভাপতি মনির উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন সদস্যের রাজনৈতিক অতীত নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই কমিটির সভাপতি মনির উদ্দিনসহ কয়েকজন ব্যক্তি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও কাওসার আহমেদ পলাশের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মনির উদ্দিন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে শামীম ওসমানের নির্বাচন কমিটির প্রধান ছিলেন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং একটি নির্বাচনী জনসভায় শামীম ওসমানকে নৌকার ফুল উপহার দিয়েছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এমনকি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ও তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগপন্থি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্তদের অনেকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে নতুনভাবে সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, আলীগঞ্জ পঞ্চায়েত কমিটিকে ব্যবহার করে পুরোনো আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যক্তিদের একটি অংশকে সংগঠিত ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ আরও রয়েছে, কমিটির কয়েকজন সদস্য এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাধারণ মানুষ অনেকেই ভয় পান। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে কেউ কেউ বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ারও চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজেদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—যাদের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, তারা ৫ আগস্টের পর কীভাবে এত দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ আলীগঞ্জ পঞ্চায়েত কমিটির সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্বে আসছেন? পঞ্চায়েত কমিটির নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি, কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় পরিবর্তন করে অতীতের ভূমিকা আড়াল করে কেউ যেন সামাজিক সংগঠনকে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। একই সঙ্গে ৫ আগস্টের আগে আন্দোলন দমন, হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে ‘ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন’—এমন গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যক্তিদের কেউ কেউ এলাকায় ফেরার চেষ্টা করছেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। এ পরিস্থিতিতে আলীগঞ্জ পঞ্চায়েত কমিটির নেতৃত্ব ও সদস্যদের রাজনৈতিক অতীত, ৫ আগস্টের আগের কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান ভূমিকা খতিয়ে দেখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ এলাকাবাসী।
তাদের একটাই দাবি—কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন বা আলীগঞ্জ পঞ্চায়েত কমিটি সংগঠনের আড়ালে কেউ যেন অতীতের বিতর্কিত ভূমিকা থেকে দায়মুক্তি নিয়ে এলাকায় নতুন করে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আলীগঞ্জে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করুক প্রশাসন।




