নারায়ণগঞ্জ । শনিবার
১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জমি নিয়ে বিরোধের জেরে
রানা ঘায়েলের মিশনে রিপন সহ প্রভাবশালী মহল

পুরো নাম ফারুক আহমেদ রিপন। লোকে তাকে চেনেন সেমাই রিপন নামে। নিজ কারখানায় ভেজাল সেমাই তৈরী করে ভ্রাম্যমান আদালতের হাতে পাকড়াও হওয়ার পর তার নামের সাথে এই টাইটেল জুড়েছে এলাকাবাসী। অবশ্য, এই যুবলীগ ক্যাডারের ললাটে জুটেছে এর চেয়েও কুখ্যাত নানা তকমা। আওয়ামী লীগের সময়কালে যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর দাপিয়ে বেড়ানো রিপন অনেকের কাছে ‘ভূমিদস্যু’ বলে পরিচিত। সেই ব্যক্তিই এখন বিএনপি নেতা আলোচিত জাকির খানের সাথে সখ্যতা গড়ে পূনরায় শহীদনগর এলাকায় ভূমিদস্যুতা সহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাকির খানে সাথে রিপনের একাধিক ছবি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।


এদিকে, কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, এক সময়ে রিপন নিজেকে সাংবাদিক বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াতো। চতুর এই ব্যক্তি সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বহু মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার আশ্রয়ে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানিয়েছেন।


নগরীর সদর থানাধীন শহীদ নগর এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ বলেন, মিথ্যাচার ও কাল্পনিক তথ্যের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিতর্কিত সংবাদ প্রকাশ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অভিনব কৌশল অবলম্বন করতেন এই সেমাই রিপন। রিপনের এই অপকৌশল ও ষড়ন্ত্রের আগুনে যেন পুড়ে অঙ্গার হয়েছে সাবেক ক্রিকেটার ও বতর্মান ক্রীড়া সংগঠক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এসএম রানা।


অভিযোগ পাওয়া গেছে, একটি জমি নিয়ে প্রতারণার আশ্রয়ের পাশাপাশি দখলদারিত্ব, হামলা, লুটপাট ও চাঁদা দাবীর ঘটনায় সেমাই রিপন ও মামুন সহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে থানায় মামলা দায়ের করাই যেন কাল হয়েছে ব্যবসায়ী এসএম রানার। ওই ঘটনার পর থেকে রানাকে ঘায়েল করার মিশনে নামে ‘অন্তরালের মাস্টার মাইন্ড’ খ্যাত সেমাই রিপন। এরই অংশ হিসেবে অর্থের খেলায় মেতে উঠেন তিনি। এসএম রানার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রমান ছাড়া ভুল তথ্য দিয়ে লাগাতার সংবাদ প্রকাশ করিয়ে তাকে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা বানাতে উঠে পড়ে লাগে এই সেমাই রিপন। প্রমানহীন এসকল লাগাতার প্রতিবেদনগুলোর ফলে এসএম রানার প্রতি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। আওয়ামী লীগ কিংবা অন্যকোনো দলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থাকলেও ক্রীড়াবীদ ও ব্যবসায়ী এসএম রানাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মামলায় আসামী করা হয়।


অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রানা একজন ব্যবসায়ী। তিনি মাদার প্রিন্ট নামক একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাছাড়া তিনি ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের তৎকালিন সহ-সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের ঐহিত্যবাহী ক্রিকেট ক্লাব শীতলক্ষ্যা ক্রিকেট একাডেমির সহ-সভাপতি পদে আছেন। আওয়ামী লীগ কিংবা অন্যকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে তার সাধারণ সদস্য পদের বিষয়েও কোনো তথ্য প্রমান পাওয়া যায়নি।


রানার স্বজনদের অভিযোগ, রিপন সহ একটি প্রভাবশালী মহলের ইশারা থাকায় তাকে আটক করে পিবিআই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে রানা অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হলেও অস্ত্রহাতে তার কোনো ভিডিও ফুটেজ কিংবা ছবির মত শক্ত প্রমাণ নেই। এরপরও রানাকে হত্যা মামলায় আসামী করার পাশাপাশি চার্জশীটেও নাম দেয়া হয়। মন্ত্রনালয় থেকে মনিটরিং সেল করে সঠিক তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ব্যতিত কাউকে চার্জশীটভুক্ত আসামী করা যাবে না বলে নির্দেশনা থাকলেও এসএম রানার ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনা মানা হয়নি বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। একটি বিশেষ মহলের ফরমায়েশে রানাকে চার্জশীটভুক্ত আসামী করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


সম্প্রতি এসএম রানা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগে এই দাবী করেছেন। সেই অভিযোগে নানা তথ্যও উল্লেখ করেছেন তিনি।


অভিযোগে রানা বলেন, ‘একটি মহল ষড়যন্ত্র করে তাকে এসকল মামলায় আসামী করা সহ আটক করিয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তার মালিকানা মাদার প্রিন্ট নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিও। এসবের নেপথ্যে রয়েছে সেই সেমাই রিপন এবং তার সহযোগি একটি প্রভাবশালী মহল। এই মহলটি কেবল মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি বরং প্রতিনিয়তই স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের নামে ঢালাও ভাবে অপপ্রচারও চালিয়েছে। এই অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টিতে এনে গ্রেফতার করানো সহ কুচক্রি মহলের ইশারায় চার্জশীটভুক্ত আসামী করা হয়েছে।’


রানা বলেন, আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো তথ্য প্রমাণ থেকে থাকে, তাহলে ৫ আগস্টের পর আমার নামে ৭ মাস পর মামলা হলো কেনো। কেন আমাকে এতদিন পর গ্রেফতার করা হলো। আমি তো পলাতক ছিলাম না। কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে আসামী করা যাবে না এবং আসামী করা হলেও যেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেই স্পটে যারা হামলাকারী ছিলো, তাদের স্পটের কোনো ছবি ভিডিও থাকলে কিংবা প্রমাণ পাওয়া গেলে চার্জশীটভুক্ত আসামী করা যাবে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এমন কোনো তথ্য প্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা অন্যকোনো সংস্থা দিতে পারেনি। আমাকে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সামনে দাঁড়াতে দেখা গেছে মর্মে একটি ভিডিও দেখানো হয়েছে। আমি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের তখন রানিং কমিটির সহ-সভাপতি ছিলাম। আমার ক্লাবের কোনো ক্ষতি হয় কিনা কিংবা কোনো তৃতীয় পক্ষ এখানে অরাজকতা সৃষ্টি করে কিনা, মোট কথা ক্লাবের নিরাপত্তার স্বার্থে আমি সেখানে ছিলাম। অথচ, আমাকে দেওভোগের একটি হত্যা মামলা আসামী দেখানো হয়েছে। সেই মামলায় দেওভোগেরই অনেক আওয়ামী লীগ বা অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের নাম নেই। কিন্তু আমাকে আসামী দেখানো হলো! আমি তো কোনো দলের লোক বা কর্মী নই। তাছাড়া যেখানে হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে, সেই স্পটের কোনো ভিডিও কিংবা ছবিতে আমি নেই। কারণ আমি তো সেখানে যা-ই নি । এরপরও আমাকে আসামী করা হলো। এতেই প্রমাণিত হয় যে, আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আসামী করে হয়রানী করা হচ্ছে। এতে করে প্রকৃত দোষিরা পাড় পেয়ে যাচ্ছে। আমি সুষ্ঠ তদন্ত চাই এবং যারা প্রকৃত দোষি তাদের শাস্তি কামনা করি। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন ফেঁসে না যায়, হয়রানীর শিকার না হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। তাই আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছি।’


জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে সেমাই রিপন ছিলেন শহীদনগর ও আশপাশের এলাকার ত্রাস। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় কতিপয় নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে বিগত সময়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞ্যান করে চলতেন। বিশেষ করে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নিজ অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রচার করিয়ে হেনস্থা করতেন বলেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও এলাকায় মামলাবাজ হিসেবেও পরিচিতি ছিলো তার। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েও হয়রানী করে বেড়ানো তার নেশায় পরিণত হয়েছিল। এমনকি নিজ শ্বশুরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে শ্বশুরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর মামলাও দিয়েছিলেন তিনি। অথচ, রিপন নিজেই একাধিক বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজী, প্রতারণা এবং ভূমিদস্যুতাসহ প্রতারণার অভিযোগে বহু মামলার আসামী।


বিশেষ করে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় সেমাই রিপনকে গ্রেফতার করার পর তাকে পূর্ববর্তী মামলাগুলোতে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিলো। নেয়া হয়েছিলো রিমান্ডেও। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলাসহ সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে হেফাজত ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের উপর হামলা ও তান্ডব চালানোর ঘটনায় এই যুবলীগ ক্যাডার ফারুক হোসেন রিপন ওরফে সেমাই রিপনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ফতুল্লা থানার একাধিক মামলাতেও আসামী হয়েছে সেমাই রিপন।


দীর্ঘদিন জেল খেটে জামিনে বের হওয়ার পর রিপন আলোচিত জাকির খানের ছায়ায় ভিরতে শুরু করে। আগে আওয়ামী লীগের পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়ালেও বর্তমানে সে জাকির খানের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >