রাত নামলেই আতঙ্কে বুক কেঁপে ওঠে চরদরবেশ ইউনিয়নের নদীপাড়ের বাসিন্দা রাবেয়া বেগমের। ছোট ফেনী নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তার টিনের ঘরটি যেকোনো সময় নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে। অসুস্থ স্বামী, দুই ছোট সন্তান আর সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। কিন্তু প্রতিদিন নদী একটু একটু করে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। ভাঙনের শব্দ শুনলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে। ঘর ভেঙে গেলে পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই।
একই আতঙ্কে দিন কাটছে সাহেবেরঘাট ব্রিজ-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সাহেদা খাতুনেরও। স্বামীহারা এই নারী একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট ভিটাটুকু আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। কিন্তু নদীর আগ্রাসনে সেই শেষ আশ্রয়টুকুও এখন হুমকির মুখে। কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী নেই। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এই ভিটাতেই কোনোমতে বেঁচে আছি। যদি এই বাড়িটাও নদীগর্ভে চলে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব, কোথায় থাকব?’
রাবেয়া কিংবা সাহেদা, তারা কেউই আলাদা কোনো গল্প নন। ছোট ফেনী নদীর ভয়াল ভাঙনের মুখে সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞা উপজেলার শত শত পরিবারের জীবন। প্রতিদিনই বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির এবং গ্রামের পর গ্রাম। কারও বসতভিটা ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে, কেউ আবার শেষ সম্বলটুকু আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করছেন কখন নদী তাদের ঠিকানাটিও গ্রাস করবে। শেষ সম্বল হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে। মুসাপুর রেগুলেটর ধসে যাওয়ার প্রায় দুই বছর পরও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে নদীভাঙনের ভয়াবহতা, আর দীর্ঘ হচ্ছে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
স্থানীয়দের দাবির মুখে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় তারা দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেন। তবে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপিত না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বেড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ছোট ফেনী ও সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী প্রায় ৪০টি স্থানে ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক বসতভিটা, বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি এবং বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তাদের মতে, মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধ করা অত্যন্ত কঠিন।
ফেনী জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও চরচান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সামছুউদ্দিন খোকন কালবেলাকে বলেন, ‘মুসাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই কৃষিজমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। দ্রুত এটি পুনর্নির্মাণ না হলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’
চরদরবেশ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘রেগুলেটর নদীতে হারিয়ে যাওয়ার পর দুই পাড়ের মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একের পর এক পরিবার তাদের বসতভিটা হারাচ্ছে। কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজীকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের বিকল্প নেই।’
উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. মোস্তফা বলেন, ‘বাংলাদেশের মানচিত্রে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি ভাঙনকবলিত এলাকায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।’
২০০৫ সালে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছোট ফেনী নদীতে ২৩ ভেন্টবিশিষ্ট মুসাপুর রেগুলেটর নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০০৯ সালে তা শেষ হয়। এই রেগুলেটর সোনাগাজী, কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞা উপজেলার পানি নিষ্কাশন এবং বঙ্গোপসাগরমুখী লোনা পানির প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় অতিরিক্ত পানির চাপে রেগুলেটরটি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকেই সোনাগাজীর চরদরবেশ, চরচান্দিয়া ও চরমজলিশপুর ইউনিয়নসহ কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়ে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘মুসাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ প্রকল্পটি আগামী একনেক সভার এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। আশা করছি, আগামী একনেক সভায় এটি এজেন্ডা হিসেবে আনতে পারব।’
নদীভাঙন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে, সেসব স্থানে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কাজ অব্যাহত থাকবে।’






