নারায়ণগঞ্জ ।
,

বিয়ের আনন্দে আত্মীয়ের বাড়িতে এসে লাশ হয়ে ফিরল দুই শিশু

বাড়িতে নতুন বউ। উঠানজুড়ে আত্মীয়স্বজন। বিয়ের আনন্দে মেতে ছিলেন সবাই। কেউ নতুন বউকে ঘিরে গল্প করছিলেন, কেউ ব্যস্ত ছিলেন অতিথি আপ্যায়নে। হাসি-আনন্দে মুখর সেই বাড়িতে মুহূর্তেই নেমে আসে শোকের ছায়া। পাশাপাশি পড়ে থাকে দুই শিশুর নিথর দেহ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি নামক গ্রামে। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্থানীয় একটি পুকুর থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

নিহত দুই শিশু হলো—রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার চম্পাতলী মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের রুপা রানী (১০) এবং তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের কাচনা গ্রামের পঞ্চমী রানী রায় (৮)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুপাতো বোন।

নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সোমবার রাতে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের আরাজি গ্রামের রতন চন্দ্র রায়ের বিয়ে হয় তারাগঞ্জের কাংলাচড়া গ্রামে। বিয়েকে কেন্দ্র করে সেখানে আত্মীয়স্বজনের সমাগম ঘটে।

বিয়েতে যোগ দিতে রতনের বোন ওমালা রানী তাঁর ১০ বছরের মেয়ে রুপাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। অন্যদিকে, রতনের বড় ভাই অজয়ের শ্যালিকা মিনতি রানী রায়ও তাঁর আট বছরের মেয়ে পঞ্চমীকে নিয়ে তারাগঞ্জের কাচনা গ্রাম থেকে বিয়েবাড়িতে আসেন।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নতুন বউকে নিয়ে বাড়িতে চলছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস। বুধবার পথ ফিরানির অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্বজনেরাও তখন ওই বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এরই মধ্যে দুপুর দেড়টার দিকে গোসল করতে পুকুরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় রুপা ও পঞ্চমী।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই শিশু আরাজি গ্রামের সুধীর রায়ের পুকুরে যায়। দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা বাড়িতে ফিরে না আসায় স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুকুরের পানিতে খোঁজ করেও প্রথমে তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে পুকুরপাড়ে তাদের স্যান্ডেল ও জামাকাপড় পড়ে থাকতে দেখে স্বজনদের সন্দেহ হয়।

এরপর স্থানীয় লোকজন পুকুরে নেমে খোঁজ শুরু করেন। বিকেল ৩টার দিকে পানির নিচ থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুকুরপাড়ে মানুষের ভিড়। পুকুর থেকে উদ্ধার করা রুপা ও পঞ্চমীর মরদেহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। একদিকে স্বজনদের আহাজারি, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন দুই শিশুর মা।

রুপার মা ওমালা রানী মেয়ের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে বিলাপ করতে করতে বলেন, “মামার বিয়েতে কত আনন্দ করবে, সেই জন্য আমার কলিজা আমার সঙ্গে আসছিল। আনন্দে খুশিও ছিল। সেই মেয়ে আমার কথা বলছে না, মা ডাকছে না। মেয়েকে বিয়ের আনন্দ দেখাতে এনেছিলাম, এখন মেয়ের লাশ নিয়ে কীভাবে বাড়ি ফিরব?”

পঞ্চমীর মা মিনতি রানীও মেয়ের মরদেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। জ্ঞান ফিরলেই মেয়ের কাছে ছুটে যেতে চাইছিলেন। স্বজনেরা তাঁকে ধরে রাখেন। বিলাপ করে তিনি বলেন, “বিয়ার খুশি মোর কপালো দুঃখ আনিল। মুই এখন মাওক কোনঠে পাইম। ওর বাপোক কি জবাব দেইম। মোর মাও কথা কওছে না কেন। তোরা মোর মাওক আনি দেন।”

আরাজি গ্রামের বাসিন্দা যতীন চন্দ্র বলেন, “কিছুক্ষণ আগেও বাড়িটা মানুষের হাসি-আনন্দে ভরা ছিল। দুই শিশুকে পাশাপাশি পড়ে থাকতে দেখে কারও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। এমন দৃশ্য এই গ্রামে কেউ কখনো দেখেনি।”

স্থানীয় ইউপি সদস্য দুলাল হোসেন বলেন, “দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নতুন বউকে ঘিরে যে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড় ছিল, সেই উঠানেই এখন শোকাহত মানুষ। ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।”

তিনি জানান, স্থানীয় লোকজন পুকুর থেকে শিশু দুটির মরদেহ উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >