নারায়ণগঞ্জ ।
,

কাস্টমস কর্মকর্তা ইরফানের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের কারণে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত বিএনপি সরকার। তাই শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে। কিন্তু মাঠের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সরকার যেখানে দুর্নীতি দমনে সচেষ্ট, সেখানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গুটিকয়েক কর্মকর্তার দুর্নীতির ঘোড়া ছুটে চলেছে লাগামহীন। এবার সেই তালিকায় বেশ বড় করে উঠে এসেছে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইরফান আলীর নাম। সম্প্রতি এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যেখানে উঠে এসেছে তাঁর কথিত দুর্নীতির সাম্রাজ্যের খবর।

অভিযোগে দাবি করা হয়, কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ দায়িত্ব পালনকালে শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধার ফাইল আটকে রেখে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করা, কোটি কোটি টাকা ঘুষ আদায় এবং সেই অবৈধ আয়ে নামে-বেনামে অঢেল সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন মো. ইরফান আলী। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেড়বাড়ী এলাকার বাসিন্দা মো. শমসের আলীর ছেলে মো. ইরফান আলী কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে চাকরির সুবাদে খুব অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন।

বন্ডেড লাইসেন্স নবায়ন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ছাড়পত্র ও প্রশাসনিক অনুমোদনের দোহাই দিয়ে তিনি শিল্পমালিকদের জিম্মি করে রাখতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (ইউনিট-১ গার্মেন্টস)’ এবং ‘রুপা প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড’-এর মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে কাস্টমস সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে এই অভিযোগে বলা হয়, ঘুষ না দিলে কাস্টমসের বিভিন্ন জটিল আইনি অজুহাতে পণ্য খালাস ও ছাড়পত্র আটকে দেওয়া হতো, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনায় মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছিল।

দুদকে দায়ের করা অভিযোগে আরও বলা হয়, কৃষকের সন্তান হয়েও এই কর্মকর্তা নিজের পাশাপাশি স্ত্রী তুলি আক্তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কিনেছেন, যা তাঁর আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগে দাবি করা হয়, মাগুরার ভায়নার মোড় এলাকায় স্ত্রী তুলি আক্তারের নামে প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৫২ শতক জমি কিনেছেন ইরফান। এছাড়া একই এলাকায় নবনির্মিত একটি ১০ তলা বহুতল ভবনে আত্মীয়দের সঙ্গে অংশীদারত্বে অন্তত ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। রাজধানীতেও রয়েছে ইরফানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের অভিজাত এলাকায় প্রায় ১,৬৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি, যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এছাড়া ঝিনাইদহ সদর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় শওকত ও মনিরের কাছ থেকে প্রায় ৬৬ লাখ টাকায় ৩ বিঘা জমি কেনেন ইরফান। ৮১ নম্বর ও ১১০ নম্বর বিষয়খালি মৌজায় তাঁর ও পরিবারের আরও অন্তত ১০ বিঘা জমি রয়েছে। গ্রামে তাঁর একতলা আলিশান বাড়ির প্রতিটি কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র (এসি) ব্যবহারসহ তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয় ঘোষিত আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ইরফান নিজে ও তাঁর পরিবারের নামে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালংকার, ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও ডিপিএস রেখেছেন।

দুদকে দেওয়া আবেদনের প্রেক্ষিতে এই কর্মকর্তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয়রা জানান, কৃষক বাবা অনেক কষ্ট করে শিক্ষিত করে তুলেছেন ইরফানকে। অভাব-অনটনের সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে ইরফানের চাকরি পাওয়ার পর। তবে খুব দ্রুত ইরফান ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে গেছেন বলে জানান অনেকে। স্থানীয়দের দাবি, রাজধানী ও শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ইরফানের বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। একসময় অভাবের তাড়নায় দিশেহারা ইরফানের পরিবার এখন এলাকার অন্যতম বিত্তবান পরিবারে পরিণত হয়েছে।

এসব গুরুতর অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মো. ইরফান আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে দুদক বলছে, প্রতিটি দুর্নীতির অভিযোগই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে নেওয়া হবে কঠোর আইনি পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >