কুষ্টিয়ার ৬৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম একটি মামলার বাদী। নিজের বাড়ি ও গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা করার ছয় দিনের মাথায় তাঁকেই অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা-পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুর এবং কার্যালয়ের ভেতরে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধর করে জখম করার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে নুরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি আসামিদের কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুরের জন্য জিনিসপত্র সরবরাহ করে সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামের বাড়ি থেকে নুরজাহান বেগমকে থানায় নিয়ে আসে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা ও পাটিকাবাড়ি পুলিশ ক্যাম্পের একটি যৌথ দল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ওই সময় তিনি রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরে দুপুরে তাঁকে কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সামাজিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে নুরজাহান বেগমের বাড়ি ও গুদামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এরপর কৃষকদলের স্থানীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং এলাকার আরও কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
এ ঘটনায় গত ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার আদালতে মামলা করেন নুরজাহান বেগম। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও কৃষকদলের ২২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ থেকে ৩০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তাধীন।
নুরজাহানের মেয়ে সেলিনা আক্তার শিল্পী বলেন, ‘সপ্তাহ দুয়েক আগে সামাজিক ও জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে আমাদের বাড়ি ও গুদামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় এলাকার একদল মানুষ। পরে কৃষকদলের স্থানীয় অফিসে নিজেরাই ভাঙচুর করে এলাকার আরও মানুষের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কিছু লোকজনও এ ঘটনায় জড়িত।’
তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমার মা বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া আদালতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত এলাকার কিছু মানুষকে আসামি করে মামলা করেন। মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে।’
মাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সেলিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ‘মামলা করার পর থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। রোববার সকালে মা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় একদল পুলিশ বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা মাকে বলে, “আপনি আদালতে গুদাম পুড়ানোর মামলা করেছেন। মামলার বাদী আপনি। এ কারণে ওসি সাহেব আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমাদের সঙ্গে চলুন।” এই বলে কয়েকজন নারী পুলিশ তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর কোথায় তাঁকে রাখা হয়েছে, তা জানি না। বাড়িতে ১৫ বছর বয়সী আমার অটিস্টিক এক কন্যা রয়েছে। মা ও আমি—আমরা তিনজন বাড়িতে ছিলাম।’
নুরজাহানের ছেলে রুহুল আমিন ফোনে বলেন, ‘আমি চাকরি করি। কোনো দল করি না। আমাকে যুবলীগ ট্যাগ দিয়ে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। তারা আমার বাড়ি ও গুদামে আগুন দিয়েছে। আমি পলাতক। পুলিশ আমার বৃদ্ধ মাকে ধরে নিয়ে গেছে। তাঁর কোনো খবর পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অধীন পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের ১ নম্বর নলকুলা কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুর ও কার্যালয়ের মধ্যে থাকা নেতা-কর্মীদের মারধর করে জখমের ঘটনায় করা মামলার তদন্তে নুরজাহান বেগমের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সেজন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা ওই মামলার আসামি হিসেবে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’
বয়োবৃদ্ধ ওই নারী কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় কীভাবে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন—এ প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আপনারা তাঁকে যতটা বৃদ্ধ ভাবছেন, আসলে তিনি ততটা না। যথেষ্ট সবল আছেন। তিনি আসামিদের কৃষকদলের কার্যালয় ভাঙচুর করতে জিনিসপত্র জোগান দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।’
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে পরে এ বিষয়ে জানাতে পারব।’
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজটি সঠিক হয়নি। পুলিশ যদি এ কাজ করে থাকে, তাহলে অবশ্যই এটি নিন্দনীয়।’




