নারায়ণগঞ্জ ।
,

ভয় ভেঙে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন রাবি শিক্ষার্থীরা

চব্বিশের জুলাই শুধু একটি মাস নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুগান্তকারী অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সারা দেশের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও (রাবি) হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। এই ক্যাম্পাসে জুলাই মানে শুধু মিছিল কিংবা সংঘর্ষ নয়, এটি ভয়কে জয় করার গল্প, হাজারো শিক্ষার্থীর ঐক্য, নারী শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ এবং ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে নতুন ইতিহাস রচনার গল্প।

১৬ জুলাই ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা, ১৭ জুলাই প্রশাসন ভবন ঘেরাও এবং পুলিশের অভিযান, ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি, ১৯ জুলাই কারফিউর নীরবতা এবং ২০ জুলাই মেসে মেসে আন্দোলনের নতুন কৌশল নির্ধারণ—মাত্র পাঁচদিনের এই ঘটনাপ্রবাহ বদলে দেয় রাবি ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী ও তৎকালীন সমন্বয়কদের ভাষ্য, এই কয়েকটি দিনই পরবর্তী জাতীয় গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাবি ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ১৬ জুলাই দুপুর থেকেই উত্তপ্ত হতে থাকে। আন্দোলনকারীরা আগে থেকেই জানতে পারেন, ছাত্রলীগও একই সময়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আন্দোলনকারীরা নিজেদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে নির্ধারিত সময়ের আগেই ক্যাম্পাসে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন।

দুপুর আড়াইটার দিকে রাবি-সংলগ্ন বিনোদপুর থেকে ২০০-২৫০ শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে প্রধান ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকেন। এ সময় শতাধিক পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা বাধা দেননি। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় অনেক শিক্ষার্থীর হাতে ছিল লাঠি, রড ও পাইপ।

মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই আবাসিক হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা দলে দলে বেরিয়ে আসেন। প্যারিস রোডে এসে মিছিলটি ক্রমেই বড় হতে থাকে। ছাত্রীদের হলের সামনে পৌঁছালে প্রায় দেড় হাজার ছাত্রী মিছিলে যোগ দেন। হাতে ঝাড়ু, লাঠি যা পেয়েছেন, তা নিয়েই তারা প্রতিরোধে নেমে পড়েন।

মিছিলটি বিজ্ঞান ভবন এলাকা পেরিয়ে হবিবুর রহমান হল ও শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে গেলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ পিছু হটে মাদার বখ্শ হলের দিকে চলে যায়।

এরই মধ্যে শাহ মখদুম, সৈয়দ আমীর আলী ও লতিফ হলসহ বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসেন। তারা তৎকালীন রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল গালিবকে ধাওয়া দিলে তিনি মোটরসাইকেলে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন।

পরে বিজয়-২৪ হল এলাকায় অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের কক্ষগুলোতে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় পুলিশ রাবি ছাত্রলীগ সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, তার কক্ষ ও দপ্তর সেল থেকে তিনটি পিস্তল, ছয়টি রামদা, ১০-১৫টি মদের বোতল, কয়েকটি দা ও রড উদ্ধার করে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সাবেক সমন্বয়ক তাসীন খান বলেন, ১৬ জুলাই রাবির সবার জন্য স্মরণীয় দিন। এদিন ছাত্রলীগ বিতাড়িত করে আমরা রাবি ক্যাম্পাসকে মুক্ত করি।

তিনি আরো বলেন, এই আন্দোলনে স্থানীয়দের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের প্রবল প্রতিরোধে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়।

আরেক সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, রাবি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ বিতাড়নের মধ্য দিয়েই ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ চূড়ান্তভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।

সাবেক সমন্বয়ক মেশকাত মিশু বলেন, ছাত্রলীগ কর্মসূচি নস্যাৎ করতে একই স্থানে জমায়েতের ডাক দেয়। প্রতিটি হলে বসিয়ে রাখে পর্যবেক্ষক। কয়েকটি হলে তালা দিয়ে দেয় যাতে শিক্ষার্থীরা বের হতে না পারে। এসব সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

তিনি জানান, মাদার বখ্শ হলের সামনে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে। সেখানেই তিনি গালিবকে সহযোগীদের সঙ্গে বেঞ্চে বসে থাকতে দেখেন। কিছু সময়ের মধ্যে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী তাদের তাড়া করে। গালিব পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ১৬ জুলাইয়ের এই ঘটনাকে অনেক আন্দোলনকারী রাবিতে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক আধিপত্য অবসানের দিন হিসেবে মনে করেন।

ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবন ঘেরাও করেন। ১৮ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাবি শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় এবং রাবি প্রশাসনের ভূমিকার প্রতিবাদে তারা উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তারসহ প্রশাসনের প্রতীকী জানাজা আদায় করেন।

১৮ জুলাই বিকেলে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাবি শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এবং সারা দেশের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

১৯ জুলাই সারা দেশে কারফিউ এবং সেনা মোতায়েন করা হয়। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়। আবাসিক হলগুলোতে হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। শিক্ষকদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট।

রাবির সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা বলেন, কারফিউয়ের মধ্যে চারদিকে অভিযান ও গ্রেপ্তারের আতঙ্ক ছিল। তাই প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি। সীমিত সুযোগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।

সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ১৯ জুলাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আন্দোলনের সংগঠন ও সমন্বয় অক্ষুণ্ণ রাখা। কারফিউ, গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কার কারণে প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হতো।

দেশব্যাপী কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েনের পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। যান চলাচল সীমিত, মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে পুরো দেশ যেন থমকে যায়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সেই নীরবতার আড়ালেই শুরু হয় নতুন প্রস্তুতি।

আন্দোলনের সম্মুখসারির কর্মী নীরব হাসান বলেন, হল খালি করার নির্দেশ এবং দোকানপাট বন্ধের পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি ফেরেননি। তারা মেসে অবস্থান নিয়ে নতুন করে সংগঠিত হন এবং আন্দোলনের গতি ধরে রাখেন।

রাজশাহী কলেজের আন্দোলনকারী রাজু আহমেদ বলেন, ওই সময়ে রাবি ও রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নজিরবিহীন সমন্বয় গড়ে ওঠে। আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও পরিকল্পনা করা হয়।

আজ দুই বছর পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, প্রকাশ্য মিছিলের পাশাপাশি নীরব প্রস্তুতি, বিকল্প নেতৃত্ব, নারী শিক্ষার্থীদের সাহসী অংশগ্রহণ এবং হাজারো শিক্ষার্থীর ঐক্যই সেই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। জুলাইয়ের সেই দিনগুলো তাই শুধু স্মৃতি নয়, রাবির ইতিহাসে প্রতিরোধ, সংহতি ও সাহসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >