সকাল সোয়া ৯টা। ১৮ জুলাই, ২০২৪। কমপ্লিট শাটডাউন চলছে। ফেসবুক খুলতেই দেখি শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল পুলিশ। মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে ছুটে মেয়ের রুমে ঢুকে দেখি, ফাঁকা। পেছন থেকে ছোট মেয়ে বলল, প্যানিক করো না। আপি ম্যাচ, নিউজ পেপার, পেস্ট, এন্টিকাটার আর মরিচ গোলানো পানি নিয়ে ব্র্যাকে গেছে। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। পুলিশ গুলি ছুড়ছে। একদিন আগে আবু সাঈদ-ওয়াসিমসহ ছয়জন মারা গেছে। আর এরা এন্টিকাটার আর মরিচের গুঁড়া নিয়ে সাহস দেখাচ্ছে!
আগের রাত থেকেই পাবলিক ইউনির্ভাসিটিগুলোর হলে আর শিক্ষার্থীদের থাকতে দিচ্ছে না প্রশাসন। পুলিশ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবে রাজু ভাস্কর্য বা টিএসসি—কোথাও জড়ো হতে পারছে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
প্রায় অবরুদ্ধ পুরো শহর। দমবন্ধ এই পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই রাস্তায় নেমে আসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হাজার হাজার। ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্দান, নর্থ সাউথের তরুণ-তরুণীরা আন্দোলনে নতুন করে আগুন ধরায় সেদিন, যা ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট।
আগে থেকেই মেসেজিং অ্যাপ ডিসকোর্ডে গ্রুপ খোলে তারা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে শেয়ার হতে থাকে গ্রুপের লিংক। চেষ্টা ছিল ১৮ তারিখে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মাঠে নামানোর।
আমার আগের রাত কেটেছে মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। কেন সে রোজ আন্দোলনে যোগ দিতে যাচ্ছে? সে পড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। বিসিএস কখনো দেবে না। কোটার তার প্রয়োজন নেই। দেশে থাকবে কি না তারও ঠিক নেই। ঘরকুনো, নিজের মধ্যে থাকা একটি মেয়ে কেন যাবে? প্রশ্নের চেয়েও জবাবগুলো ছিল অনেক তীক্ষ্ণ, ফেলো স্টুডেন্টরা গুলি খাবে, মরবে আর সে কাওয়ার্ডের মতো ঘরে বসে থাকবে? সব শেষে বলল, ‘একাত্তরে তোমার মতো মা থাকলে এ দেশ আর স্বাধীন হতো না।’
সকাল ৭টায় কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে গেছে।
ওদের পরিকল্পনা কোনোভাবে লিক হয়ে গিয়েছিল। ১৮ জুলাই ভার্সিটির গেটে আগেই পুলিশ এসে অবস্থান নেয়। পুলিশকে সামনে রেখে রাস্তায় বসে পড়ে শিক্ষার্থীরা। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ওদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল, আইডি কার্ড নেই এমন কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়া যাবে না। অচেনা অনুপ্রবেশকারীদের বিক্ষোভে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।
অল্প সময়ের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশ। ধাওয়া দিয়ে তুলে দেয় শিক্ষার্থীদের। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এক পর্যায়ে ব্র্যাকের গেট খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ বাইরে থেকে টিয়ার শেল ক্যাম্পাসে ছুড়তে থাকে। কোণঠাসা হয়ে পড়ে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা।
এ সময় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটির শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে ব্র্যাকের দিকে ছুটে আসে। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে এগোতে থাকে নর্থ সাউথসহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা। রোকেয়া সরণির পুরো রাস্তা রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মেয়ের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ হয় বেলা সাড়ে ১১টায়। ফোন করে জানায়, ক্যাম্পাসে আছে। টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় ওরা কেউ শ্বাস নিতে পারছে না। মুখ ও হাতে পেস্ট মেখেছে। খবরের কাগজ পুড়িয়ে ধোঁয়া বানানোর পরও ঝাঁজ যাচ্ছে না।
আমি তখন যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় একটি অনলাইন পোর্টালে কাজ করি। সিদ্ধান্ত নিলাম অফিসে যাব, ওখান থেকে হেঁটে ব্র্যাকে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব। ভেঙে ভেঙে অফিসে পৌঁছালাম। কিছুটা অফিসের গাড়িতে, কিছুটা রিকশায় আর বাকিটা হেঁটে। স্টুডেন্টদের বাধা, পুলিশ-ছাত্রলীগের ব্যারিকেড পার হয়ে ব্র্যাক পর্যন্ত আর এগোনো গেল না।
সারা দেশ থেকে ভয়াবহ নৃশংসতার খবর আসতে থাকে। দেশের ৪৭ জেলায় পুলিশ-র্যাব, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় ৩১ জন নিহত হয়। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ২৬ জন। শুধু ঢাকায়ই নিহত হয় ১৯ জন।
ঘণ্টাখানেক চুপ থাকার পর মেয়ের এসএমএস আসে। পুলিশ বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে বৃষ্টির মতো গুলি করছে। বহু স্টুডেন্টের শরীরে গুলি লেগেছে। বলল, ‘পাখির মতো স্টুডেন্টদের মারছে ওরা।’ মনে হলো কেউ খুব শক্ত হাতে কঠিনভাবে আমার গলা টিপে ধরেছে। শ্বাস নিতে পারছি না। আরেকটি বড় টেক্সট ফোনে ঢুকল, পুলিশের গুলি থামাতে ব্র্যাকের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে। হাতে লাঠি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দিচ্ছে। পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল হাতে নিয়ে আবার ছুড়ে দিচ্ছে পুলিশের দিকে। সঙ্গে যোগ দিয়েছে ইস্ট ওয়েস্টসহ আরো কয়েকটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা।
প্রাণ বাঁচাতে কানাডিয়ান ইউনিভাসির্টির দোতলায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পুলিশ। তবে সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি আর টিয়ার শেল ছুড়ছে তারা।
এবার আর টেক্সট না, ফোনই করে মেয়ে। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভেতরে ঢুকে ওই পুলিশ সদস্যদের থামাতে যাচ্ছে ওরা। জানিয়েই ফোন কেটে দিল। হতবিহ্বল লাগছিল। এর ৩০-৩৫ মিনিট পর জানালো দোতলায় আটকে পড়া পুলিশ ছাদে উঠে গেছে। ওদের গুলি-টিয়ার শেল শেষ। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দখল করে আছে স্টুডেন্টরা। এক পুলিশ সদস্যকে ওরা ধরে ফেলেছিল। তার কাপড় খুলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কিছু চড়-থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
এর মধ্যেই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। উত্তরা, সাভার, যাত্রাবাড়ী রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে টেলিফোনে খবর আসছে। ছাত্র মারা যাওয়ার খবর আসছে। ধানমন্ডিতে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ নিহত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে উত্তরার নর্দান ইউনিভাসিটির আসিফ ও শাকিল নামে দুটি ছেলে। উত্তরায় এপিসি নিয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে পুলিশ।
দুপুরের দিকে বাড্ডা থেকে সহকর্মী ফোন করলেন। জানালেন, ক্যানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের রেসকিউ করার জন্য র্যাবের হেলিকপ্টার যাচ্ছে। আমার মেয়ে চাইলে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে আসতে পারে। মেয়েকে জানালাম। উত্তরে মেয়ে জানাল, ‘আমি প্রোটেস্ট করতে আসছি। আমি কাওয়ার্ড না। আমি পালাব না।’ ফোনটা বন্ধ করে দিল। আমি কোনোভাবেই আর ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম না।
বিকালে শাহবাগে জড়ো হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। সাড়ে ৫টার দিকে কফিন মিছিল শুরু হতেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্র-জনতা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে বাধ্য করে প্রশাসন। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে নিজ ভবনে আটকে পড়েন উপাচার্য। পরে পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের উদ্ধার করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় শিক্ষার্থীরা, আহত হয় শতাধিক। সারা দিনে সারা দেশে শুধু পুলিশের হিসাবেই আহত হয় দেড় হাজার মানুষ।
বিকালের দিকে বিটিভির কার্যালয়েও একাধিকবার হামলা চালানো হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় মেয়ে আমাকে ফোন করে। জানায়, এবার সে বাড়ি ফিরতে চায়। রাস্তায় কোনো বাস বা রিকশা নেই। পুলিশ নেই। শিক্ষার্থীরা ফিরছে। তার আর হাঁটার শক্তি নেই। এবার আমি আমার সহকর্মীর সহায়তা নিতে পারলাম। তিনি মেয়েকে নিয়ে অফিসে ফিরলেন। আমার টুকটুকে ফর্সা তালপাতার সিপাই মেয়ে পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। মনে হলো কেমন যেন কুঁকড়ে আছে। গলার কাছে উঁচু হয়ে আছে ছোট্ট একটি বল । কী ওটা? চামড়া সরে লাল হয়ে আছে জায়গাটা। ছররা বুলেটের টুকরা? মাথা থেকে বলটাকে ঝেড়ে ফেললাম। মেয়ে বেঁচে আছে। সুস্থ। আর কী চাওয়ার আছে?
সিদ্ধান্ত নিলাম পরদিন থেকে চাকরি-বাকরি বাদ। মেয়ের সঙ্গে বিক্ষোভে নামব।





