দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে দেশের মানুষ তা মেনে নেবে না।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আয়োজিত এক কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণকে পাশ কাটিয়ে কোনো শাসনব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একদলীয় শাসনের পরিণতি কখনোই শুভ হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে জনগণই তার জবাব দেবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এবং এতে নিহত ও আহতদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে শহীদ ও সংগ্রামী মানুষের আত্মত্যাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের অবদানকে খাটো করা কিংবা উপহাস করার কোনো সুযোগ নেই। শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন ও গণভোট প্রসঙ্গে জামায়াত আমির দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের পূর্ণ প্রতিফলন সেখানে ঘটেনি। গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণের রায়। সেই রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা টেকসই হতে পারে না।
সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বৃদ্ধির অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেলা পরিষদের মতো প্রতিষ্ঠানেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের মাধ্যমে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদীয় রাজনীতির পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, বিরোধী মতকে অবজ্ঞা ও হেয় করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়। অতীতে এমন প্রবণতা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। নতুন প্রজন্ম সংঘাত বা বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে।
জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটের আকার বড় হওয়াই সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়, বরং তার বাস্তবায়ন সক্ষমতাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাতের অতীত ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় দেশের শিল্প রাজধানী হিসেবে পরিচিত এ জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল অসামান্য। শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নারায়ণগঞ্জ আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার জবাব দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে দীর্ঘদিন বিভ্রান্ত রাখা সম্ভব নয়। দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বকে কথার ভিত্তিতে নয়, বরং কাজ ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে শিখেছে। দেশের স্বার্থে সৎ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কর্মী সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দামসহ অন্যান্য নেতারা। এ সময় আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারের নাম ঘোষণা করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান।কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জামায়াতের এই কর্মী সম্মেলন।







