নারায়ণগঞ্জ । সোমবার
৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ,
২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ
বিশ্ব এইডস দিবস আজ 

আজ বিশ্ব এইডস দিবস। প্রতি বছর ১ ডিসেম্বর দিবসটি পালিত হয়; যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এইচআইভি/এইডসের সমস্যা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। 

দিনটি সেই সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ, যাদের আমরা এই রোগে হারিয়েছি এবং যারা এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশের দিন।

২০২৫ সালের মূল বার্তা ‘চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে, নতুনভাবে এইডস প্রতিরোধ গড়ে তোলা’ – যা দেখায় যে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং স্বাস্থ্য খাতে অর্থের ঘাটতি আমাদের অগ্রগতিকে ধীর করে দিয়েছে। তবে এই বার্তা একই সঙ্গে আশা জাগায় যে আমরা চাইলে আরো শক্তিশালী ও আধুনিক এইডস প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য থেকে বোঝা যায় যে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ আছে। ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে প্রায় চার কোটি আট লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে ছিলেন। একই বছরে ১৩ লাখ নতুন সংক্রমণ এবং প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে এইডস-সংক্রান্ত জটিলতায়। যদিও এই সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় অনেক কমেছে, তবু এখনো প্রায় ৯২ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে না।

বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সমাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা।

এদিকে এবছর প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল আমাদের নতুন আশার আলো দেখায়। দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন ভিত্তিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এখন অনেকের জন্য সহজ ও টেকসই চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি নতুন মডেলের গবেষণা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার আরো নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করছে; যা সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে অর্থসংকট ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ অগ্রগতিকে আটকে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।

তাই ২০২৫ সালের বিশ্ব এইডস দিবস আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতার কারণে আমরা অনেক সাফল্য অর্জন করেছি, কিন্তু সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে এবং বৈষম্য দূর না হলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এইডস মোকাবিলা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়— এটি মানবিক অধিকার, ন্যায়, সমতা এবং সম্মানের বিষয়।

তবে বাংলাদেশে এইডস সংক্রমণের প্রবণতা কম হলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে ওষুধ ব্যবহারের ধারা পরিবর্তন, পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব এবং প্রতিরোধমূলক পর্যাপ্ত সেবার অভাবে আক্রান্ত লোকজন ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশে সংক্রমণের হার এখনো শূন্য দশমিক এক শতাংশের নিচে, তবে বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা ব্যবহারকারী (পিডব্লিউআইডি), যৌনকর্মী, যারা পুরুষ হয়ে পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক রাখেন, ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় এবং দেশে ফেরত আসা প্রবাসী কর্মীরা।

ইউএনএইডস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৭ শতাংশ মানুষ নিজেদের এইচআইভি আক্রান্তের বিষয়ে জানেন। তবে বাংলাদেশে এই পরিমাণ আরো কম। কারণ সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মানুষ পরীক্ষা এবং চিকিৎসা এড়িয়ে চলেন।

বাংলাদেশের এইচআইভি আক্রান্তদের বড় অংশ বিদেশ দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে পাওয়া গেছে, যারা বিদেশে সংক্রমিত হয়ে দেশে ফিরে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বিশ্বব্যাপী এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী ও কন্যা এবং ২০২৪ সালে নতুন সংক্রমণের ৪৫ শতাংশ নারী। বাংলাদেশে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা বেশি হলেও, প্রবাসী কর্মীদের স্ত্রীদের মধ্যে ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ, সচেতনতার অভাব এবং লিঙ্গভিত্তিক বাধা ও  চিকিৎসার অভাব।

বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে- বড় শহরের বাইরে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এইচআইভি ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ওষুধ) সীমিত, পুরুষদের মধ্যে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কম, শিশুদের চিকিৎসা গ্রহণে ফাঁক। তবে এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী রয়েছে, ২০২৪ সালে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশু এআরটি পেয়েছে।

ইউএনএইডস জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ইনজেকশন নেশাকারীদের সাত দশমিক এক শতাংশ, সমকামী পুরুষদের সাত দশমিক ছয় শতাংশ এবং ট্রান্সজেন্ডারদের আট দশমিক পাঁচ শতাংশ মানুষ এইচআইভি আক্রান্ত; যা বিশ্বব্যাপী শূন্য দশমিক সাত শতাংশ হার থেকে অনেক বেশি।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক এইচআইভি তহবিল কমে ১৮ দশমিক সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে; যা প্রয়োজনের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আরো অর্থায়ন কমে যায়, তবে বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অগ্রগতি আরো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছেন, সেগুলো হলো- সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে এইচআইভি পরীক্ষা সম্প্রসারণ এবং পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির (এআরটি) জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ, ইনজেকশন নেশাকারীদের জন্য বিশেষভাবে হ্যারম-রিডাকশন সেবা বৃদ্ধি, নারী, যুবক ও ট্রান্সজেন্ডারদের প্রয়োজনমত ফোকাসড সেবা দেওয়া, ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য প্রতিরোধমূলক প্রোগ্রাম বৃদ্ধি, স্থানীয় তহবিল বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটিং মেকানিজম (বিসিসিএম) ও পিএলএইচআইভি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মো. হাফিজুদ্দিন মুন্না বলেন, বাংলাদেশে এইচআইভি সেবার মান সংকটাপন্ন। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ এইচআইভি প্রোগ্রাম সীমিত করা হয়েছে। কমিউনিটির কাছ থেকে সেবা সরিয়ে হাসপাতালে স্থানান্তরের ফলে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হয়েছে। এইচআইভি চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা উভয়ই প্রয়োজন। কিন্তু এ নিয়ে কোনও বিশেষ বিভাগ নেই। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >