হিমালয় অঞ্চলে এক প্রাণঘাতী সুনামির মতো পানির তোড় ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত আছড়ে পড়ে পুরো গ্রাম তলিয়ে দেওয়ার কয়েক দিন পর শনিবার (২৯ আগস্ট) নেপাল ও চীনে নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষকে খুঁজে বের করতে উদ্ধারকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশ দুটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় তিন হাজারে পৌঁছেছে এবং ৬৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনের মৃতদেহ স্রোতে ভেসে বহুদূরে ভারতে চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
নেপাল স্কাউট ডিজাস্টার রেসপন্স টিমের উদ্ধারকর্মী কাওয়ান কৈরালা জানিয়েছেন, তারা হাঁটু সমান থকথকে কাদার মধ্যে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ১৮ ঘণ্টার শিফট শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ তাদের স্বজনদের লাশ চায়, জীবিত হোক বা মৃত, কিন্তু আমরা তো তাদের খুঁজে পাচ্ছি না… চারপাশের কাদা তো দেখতেই পাচ্ছেন। আমার জন্যও এটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এই ধরনের দৃশ্য আমি প্রথমবার দেখছি। চারদিকে শুধুই কাদা। আমরা আগে নেপালে বন্যার মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হইনি।’
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, তিব্বত-নেপাল সীমান্তে বুধবারের এই দুর্যোগটি একটি হিমবাহ ধসের কারণে ঘটেছিল। নদীপ্রবাহের ভাটি অঞ্চলে এর ফলে ধ্বংসাবশেষের চিত্র ভয়াবহ রূপ নেয়। হিমবাহ ধসের সঠিক কারণ এখনো অস্পষ্ট হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ গরার কারণে এই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কিছুই অবশিষ্ট নেই
জীবিত উদ্ধার হওয়া মানুষগুলো নিখোঁজ স্বজনদের পরিণতি জানতে এক যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার মুখোমুখি এবং শূন্য থেকে নতুন করে জীবন গড়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
নেপালের নুয়াকোট জেলার বুদ্ধি রাম ডাংগোল বলেন, ‘নদীর তীরের সমস্ত জনবসতি ভেসে গেছে। আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ একই জেলার প্রধান উদ্ধার কেন্দ্র বিদুরের সেনা ঘাঁটিতে স্বজনরা দেয়ালে সাঁটানো উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকার চারপাশে ভিড় জমাচ্ছেন। তালিকায় চরম হতাশায় চোখ বোলাতে বোলাতে কালকা সারদা বলেন, ‘আমি এখানে আমার ছেলেকে খুঁজতে এসেছি। সে একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিক ছিল, কিন্তু আমি তার নাম পাচ্ছি না, আর কর্তৃপক্ষও কিছু বলছে না।’
বিশাল জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু এই এলাকায়। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেখানকার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৯৩৩ জন শ্রমিক এবং ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিককে নিখোঁজদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ট্র্যাকার এবং তিব্বতের পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত কৈলাশ পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
ভয়াবহ মানসিক আঘাত
রেড ক্রস জানিয়েছে, বুধবারের বিপর্যয়ের আঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালে শনিবার (২৯ আগস্ট) জানান, বিধ্বংসী এই বন্যার পর নেপালের পুনর্গঠন ব্যয় শত কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, ‘জরুরি বিষয় হলো যতটা সম্ভব মানুষের জীবন বাঁচানো এবং উদ্ধার কাজ চালানো।’ আটকে পড়া মানুষদের অবস্থান চিহ্নিত করতে হেভি-লিফ্ট ড্রোন এবং প্রযুক্তিসহ বিশেষ সহায়তার আবেদন জানা তিনি।
মরদেহ শনাক্ত করার জন্য ফরেনসিক টেস্টিং কিট এবং সেগুলো সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজার ইউনিটের আহ্বান জানিয়ে শিশির খানালে বলেন, ‘পানিতে থাকা মরদেহগুলো দ্রুত পচে যেতে পারে। এই মরদেহগুলোকে দীর্ঘদিন হিমাগার বা তুষারাবস্থায় রাখার মতো আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।’
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও পানির চরম সংকট দেখা দেওয়ায় জরুরি দলগুলো জীবিতদের খুঁজে বের করতে রাতদিন এক করে কাজ করছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কা নিখোঁজদের অনুসন্ধানে জটিলতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বরফ ও কাদার স্রোত বিশাল হ্রদ তৈরি করেছে, এবং এই কৃত্রিম হ্রদগুলোর কারণে আরও বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এদিকে, তিব্বত থেকে তথ্য পাওয়ার একমাত্র উৎস চীনা কর্তৃপক্ষ। সেখানে নতুন করে বন্যার ঝুঁকির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরোং অঞ্চলে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। নেপাল অংশে, শনিবার ত্রিশূলী ৩এ এবং ৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ১০০ জন মানুষের কাছে পৌঁছাতে সৈন্যরা মরিয়া হয়ে ড্রিল করার চেষ্টা করছিল। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, প্রবেশপথ খোলার জন্য দলগুলো কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছে এবং সহায়তার জন্য ভারতীয় একটি বিশেষ টানেল উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছেছে। ত্রিশূলী উপত্যকা ধরে থাকা অন্যান্য বাঁধ প্রকল্প থেকে উদ্ধার পাওয়া শ্রমিকরা এমন এক দুর্যোগের বর্ণনা দিয়েছেন যা ভীতিকর গতিতে তাদের গ্রাস করেছিল।
নেপাল আজ শনিবার ৬২৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। দেশটিতে শত শত বিদেশি নাগরিকসহ ২ হাজার ৪২৬ জন এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। সীমান্তের ওপারে তিব্বতে সাতজন মারা গেছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে। এখানে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, তারা তিব্বত থেকে আটকে পড়া ৫৫৫ জন পর্যটক এবং ৪৯৯ জন চীনা বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। ভারতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নেপাল হতে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন।




