বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া শর্টগানের গুলিতে এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন গাজী সালাউদ্দিন। অপর চোখেও দেখতেন ঝাপসা। মুখমণ্ডলের পাশাপাশি গলায়ও একাধিক গুলি লেগেছিল তার। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, গলায় লাগা গুলির স্প্লিন্টার শ্বাসনালি ছুঁয়ে আছে, এটি বের করা দুঃসাধ্য। শরীরে সেই স্প্লিন্টার নিয়েই ১৫ মাস পর রোববার রাতে মারা গেলেন এই জুলাই যোদ্ধা।
রোববার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে রাত নয়টার দিকে তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তিনি মারা যান।
নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে বাড়ি সালাউদ্দিনের। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একতলা ভবনের দুটি কক্ষে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের গেজেটভুক্ত ‘অতি গুরুতর আহত’ তালিকার ১৩২ নম্বরে ছিল তার নাম। সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি তার কর্মসংস্থানের জন্য মুদি দোকানের মালামালও কিনে দিয়েছিল ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’।
শারীরিক অবস্থার কারণে দোকানে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না সালাউদ্দিন। বড় ছেলে বসতেন দোকানটিতে।
সালাউদ্দিনের বড় ছেলে আমির ফয়সাল রাতুল বলেন, “চোখ ছাড়াও বাবার সারামুখে, গলায়, হাতেও গুলি লেগেছিল। গলার স্প্লিন্টারগুলো বের করা যায়নি। ডাক্তার তাকে কথা বলতেও প্রায় নিষেধ করেছিলেন। গত কয়েকদিন খুব কাশতেন, আর কাশির সঙ্গে রক্তও পড়ত।”
পরিবারের অন্য সদস্যরা জানান, গত বছরের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ শহর যখন উত্তাল, তখন ভূঁইগড় এলাকার একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন সালাউদ্দিন। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনিও। ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাঁধলে আরও অনেকের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হন সালাউদ্দিনও।
নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পরদিন তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারও হয় তার, কিন্তু এক চোখের দৃষ্টি আর ফিরে পাননি। শুধু তাই নয়, শরীরের কয়েকটি অংশে গুলির স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
“শুরুর দিকে ধার-দেনা করে বাবার চিকিৎসা চালিয়েছি। পরে সরকার পতনের পর নতুন সরকার সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি আর ফেরেনি। গলার স্প্লিন্টারটাও তাকে অনেক ভোগাচ্ছিল। কাশির সঙ্গে তার রক্ত পড়ত, গলা ব্যথা করত। কিন্তু আমরা জিজ্ঞেস করলেই চেপে যেতেন। কাশি উঠলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তারপর কাশতেন,” কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন সালাউদ্দিনের ছেলে রাতুল।
তবে আরও উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হলে সালাউদ্দিন বেঁচে থাকতেন বলে মনে করেন তার স্ত্রী রানী বেগম। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এ নারী বলেন, “আমাদের কোনো পুঁজি নাই। উনি যা পাইতেন তাই দিয়ে সংসার চলত। এইভাবে তারে হারামু ভাবতেই পারি নাই।”
সোমবার (২৭ অক্টোবর) সকালে গোদনাইল বাজারে সালাউদ্দিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।






